ঢাকা, ১৬ জুন (বিডিইকোনমি ডটনেট) — বৈশ্বিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ফিচ রেটিংস’ বলেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কর আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) আন্তর্জাতিক এই রেটিং এজেন্সির প্রকাশিত এক নতুন পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কর আদায়ের ক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের আর্থিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিম্নমুখী ঝুঁকি (ডাউনসাইড রিস্ক) তৈরি হয়েছে।
ফিচ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নতুন বাজেটে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক ৮ শতাংশ ছিল। এই লক্ষ্যমাত্রা যদি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে ১৯৯৩ সালের পর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত।
সংস্থাটি মনে করে, আগামী অর্থবছরের জন্য সবচেয়ে বড় স্বল্পমেয়াদী আর্থিক চ্যালেঞ্জ হলো কর আদায় প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়ন। কারণ, প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে সরকারি ব্যয় ১৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে এর সমান্তরালে রাজস্ব আদায়ে ১৮ শতাংশের উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে।
বৈশ্বিক এই সংস্থাটি অবশ্য স্বীকার করেছে যে, বাজেটে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে—যেমন কর দাখিল প্রক্রিয়া সহজ করা, ঢালাও কর অব্যাহতি বা রেয়াত কমিয়ে আনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য ভ্যাট প্রদান সহজ করা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে কর-বহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানো। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে করের আওতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মূল্যায়নে ফিচ সতর্ক করে বলেছে, “অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশে এই ধরনের অনেক ভালো সংস্কার উদ্যোগ অতীতে ভেস্তে গেছে বা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি।”
বাজেটে উচ্চ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রেটিং এজেন্সিটি। তারা উল্লেখ করেছে, মোট বাজেটের ২৯.৭ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এবং ১৮.৭ শতাংশ অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি নবনির্বাচিত সরকারের মূল রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন হলেও, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।
অবশ্য ফিচ একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেছে, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট বরাদ্দের চেয়ে কম খরচ করার একটি প্রবণতা রয়েছে। ফলে যদি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতিও তৈরি হয়, তবে এই কম খরচের প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত আর্থিক ঘাটতি (ফিসকাল ডেফিসিট) নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ঢাল (বাফার) হিসেবে কাজ করবে।
এই প্রেক্ষাপটে, ফিচ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের আর্থিক ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশে সীমিত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার সাথে মিলে যায়। তবে ফিচ এই হিসাবটি করেছে কম রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে কম সরকারি ব্যয়ের সমীকরণ ধরে।
এদিকে সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রাকে “অতিরিক্ত আশাবাদী” আখ্যা দিয়েছে ফিচ। সরকার যেখানে আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে, সেখানে ফিচ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ৩.৫ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি, নীতিগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তাকে এই রক্ষণশীল পূর্বাভাসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে জ্বালানি খাতে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ফিচ। সংস্থাটি পর্যবেক্ষণ করেছে যে, দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগগুলো যদি নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা মধ্যমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করবে।