মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ:
ঢাকায় এলপিজির তীব্র সংকট, সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম উপেক্ষা করে দেদারসে বাড়তি আদায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে মূল ভিত্তি ‘বিশ্বাস’: তানভীর শাহরিয়ার গনি পরিকল্পিত নগরায়ণে জেলা ও সিটি করপোরেশনে নতুন মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তীব্র সংকটের মাঝেই বাড়ল এলপিজির দাম, খুচরা বাজারে অস্থিরতা জাপান বাংলাদেশের বিশ্বস্ত উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদার: রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের জন্য নীতির ওপর দায় চাপাচ্ছেন মার্কিন নাগরিকরা প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে সম্মত বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া ৫৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে শুরু হলো ‘রভি-দৃষ্টি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬’ রপ্তানি বাড়ছে, ভরসা এখনো পোশাকে—বৈচিত্র্যের নতুন ইঞ্জিন কি তৈরি হচ্ছে?<gwmw style="display:none;"></gwmw>

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: ট্রাম্পের জন্য এক ‘জিততে না পারা’ মরণফাঁদ?

আনিস নূর, ঢাকা: দ্বিতীয় মাসে পা রাখা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে বিশ্লেষকরা অভিহিত করছেন ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘জিততে না পারা’ যুদ্ধ হিসেবে। একদিকে ইরানের অদম্য প্রতিরোধ এবং অন্যদিকে খোদ নিজ দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক মরণফাঁদে আটকা পড়েছেন।

রণকৌশলে ইরানের টেক্কা

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান তার প্রচলিত ও ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (asymmetric warfare)-এর অসাধারণ সমন্বয় প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর তেহরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। জ্বালানি বাজারের এই ‘লাইফলাইন’ নিজেদের কবজায় রাখায় ইরান কার্যত বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলেছে, যা তাদের আলোচনার টেবিলে এক বিশাল সুবিধাজনক অবস্থানে (leverage) নিয়ে গেছে।

ঘরে-বাইরে কোণঠাসা ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমানে দ্বিমুখী চাপের সম্মুখীন। আমেরিকার অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে, যা দেশজুড়ে বিশাল গণবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ট্রাম্পের অনুকূলে নেই। ইসরায়েল ছাড়া আমেরিকার কোনো পুরনো মিত্রই এই ‘সামরিক হঠকারিতা’র দায় নিতে বা যুদ্ধে জড়াতে রাজি নয়।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরাসরি ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করে একে ‘অগম্ভীর’ বলে অভিহিত করেছেন। অনেক ন্যাটো সদস্য দেশ তাদের আকাশসীমা এবং মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে বিশ্বমঞ্চে একরকম নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে।

ভুল হিসাব-নিকাশের খতিয়ান

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের একগুচ্ছ ভুল হিসাব-নিকাশের ফসল। তারা ধারণা করেছিলেন:

কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।

শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলে ইরানি প্রশাসনে ধস নামবে।

ইরান মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে টিকতে পারবে না।

বাস্তবতা বলছে ঠিক উল্টো কথা। ইরান শুধু টিকে থাকেনি, বরং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় সফল পাল্টা আঘাত হেনে আমেরিকার ‘নিরাপত্তা ছাতা’র সীমাবদ্ধতাও ধরিয়ে দিয়েছে।

৬ এপ্রিলের আল্টিমেটাম ও ‘খার্গ দ্বীপ’ ঝুঁকি

আজ ৬ এপ্রিল, ট্রাম্পের দেওয়া আল্টিমেটামের শেষ দিন। এই সময়ের মধ্যে ইরানকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তেহরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন জল্পনা চলছে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল ‘খার্গ দ্বীপ’ দখলের অভিযান নিয়ে। ট্রাম্প নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “হয়তো আমরা এটি দখল করব, হয়তো করব না।”

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অভিযান হতে পারে আমেরিকার জন্য ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুল। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের বাহিনী মার্কিন সেনাদের ওপর ‘আগুনের বৃষ্টি’ বর্ষণ করতে প্রস্তুত।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাব

এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব বাজারে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও এর বাইরে নয়।

উপসংহার

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসে না। আফগানিস্তানে ২০ বছরের ব্যর্থতা যা শেখাতে পারেনি, ইরান যুদ্ধ হয়তো ওয়াশিংটনকে সেই তিক্ত সত্যেরই মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্প যদি এখন যুদ্ধ থেকে পিছু হটেন, তবে তা হবে চরম অবমাননাকর পরাজয়; আর যদি যুদ্ধ চালিয়ে যান, তবে সেটি হবে এক অন্তহীন ধ্বংসযজ্ঞ। মাঝখানে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।