ঢাকা, ২৭ জুলাই (বিডিইকোনমি)-টানা তিন মাস নেতিবাচক ধারায় থাকার পর এপ্রিল ও মে মাসে আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ। অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে এসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বাড়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ প্রাপ্তিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ প্রাপ্তি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০৫ কোটি টাকা।
প্রধানত গত এপ্রিল ও মে মাসে সঞ্চয়পত্র কেনার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙানোর প্রবণতা কমে যাওয়ার কারণেই নিট প্রবৃদ্ধির দীর্ঘদিনের ঋণাত্মক ধারা কেটে গেছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কারণেই বিনিয়োগকারীরা আবার সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, “ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এখনো সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় মনে করেন। তাছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের চেয়ে নির্দিষ্ট আয়ের স্থায়ী সরকারি মাধ্যমে অর্থের চাহিদা বাড়ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে মেয়াদপূর্তিতে আসল পরিশোধ ও আগাম ভাঙানো বাবদ অর্থ বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে, সেটিকেই নিট বিনিয়োগ বলা হয়। সরকার সাধারণত বাজেটের অর্থায়ন ঘাটতি মেটাতে এই অর্থ ব্যবহার করে থাকে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে অর্থবছরের শুরু থেকে বিক্রিতে মন্দা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত মে মাসে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি হয়েছে ৬,৪৬৪ কোটি টাকা, যার বিপরীতে প্রাক-মেয়াদ ও মেয়াদপূর্তির ভাঙানো বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫,২৩০ কোটি টাকা। ফলে মে মাসে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১,২৩৪ কোটি টাকা। এর আগে এপ্রিল মাসে ৭,৯৭৩ কোটি টাকার বিক্রির বিপরীতে ৫,৭১২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়, যেখানে নিট ইতিবাচক প্রবাহ ছিল ২,২৬০ কোটি টাকা।
এপ্রিল ও মে মাসের এই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এর আগের টানা তিন মাসের বিশাল ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে। কারণ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ২,৬৯০ কোটি টাকা ঋণাত্মক (নেগেটিভ) অবস্থায় ছিল।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম ১১ মাসে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটি টাকা। যা আগের অর্থ বছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ের তুলনায় অনেকটা ভালো অবস্থায় রয়েছে; কারণ ওই সময় নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল প্রায় ৫,৮৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন বিক্রির চেয়ে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতেই বেশি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থ বছরের ১১ মাসের মধ্যে ৭ মাস নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ছিল— জুলাই (১,২৯৩ কোটি টাকা), আগস্ট (২৭৯ কোটি টাকা), সেপ্টেম্বর (৩৭৩ কোটি টাকা), অক্টোবর (৪২৪ কোটি টাকা), ডিসেম্বর (৩৮৪ কোটি টাকা), এপ্রিল (২,২৬০ কোটি টাকা) এবং মে (১,২৩৪ কোটি টাকা)। অন্যদিকে বাকি ৪ মাস নিট বিনিয়োগ নেগেটিভ ছিল— নভেম্বর (২৯৩ কোটি টাকা), জানুয়ারি (১,৮৫১ কোটি টাকা), ফেব্রুয়ারি (১,১৬৫ কোটি টাকা) এবং মার্চ (২,১৩৫ কোটি টাকা)।
মুনাফার হার হ্রাস, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা এবং কঠোর তদারকির কারণে সঞ্চয়পত্রে মানুষের বিনিয়োগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। একই সঙ্গে ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং ব্যাংকের লোভনীয় সুদের হারের কারণেও অনেকে সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
এদিকে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকার তার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়েছে। এবার সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্র ৮,৫০০ কোটি টাকার নিট ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪,০০০ কোটি টাকা কম।