ঢাকা, ৮ জুলাই : বিশ্বজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগের মন্দাভাব কাটিয়ে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড (UNCTAD) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, বিগত বছরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ রেকর্ড ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১.৭৮ বিলিয়ন (১৭৮ কোটি) মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক এফডিআই প্রবাহ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণের ওপর ভর করে গত ২৫ বছরে দেশে বিদেশি সম্পদের পুঞ্জীভূত মজুত বা এফডিআই স্টক ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালে যেখানে বাংলাদেশের মোট এফডিআই স্টক ছিল মাত্র ২১৬ কোটি ডলার, ২০২৫ সাল শেষে তা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে দাঁড়িয়েছে ১,৯৬৩ কোটি (১৯.৬৩ বিলিয়ন) ডলারে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নীতিগত উদারীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের টেকসই পরিবেশের কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে নতুন বা গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের (একেবারে নতুন শিল্প স্থাপন) অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
বিনিয়োগের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকার পেছনে ঢাকার সাম্প্রতিক নীতিগত সংস্কার বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করতে ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতি শিথিল করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বিশেষ ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (Agreement on Reciprocal Trade) স্বাক্ষর করেছে। এই কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্ক্রিনিং বা যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, তথ্য আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার পথ সুগম হয়েছে।
বাইরে বিনিয়োগের চিত্র:
দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগের (আউটওয়ার্ড এফডিআই স্টক) ক্ষেত্রেও ধীর কিন্তু স্থিতিশীল অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০০০ সালে বিদেশে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের পরিমাণ যেখানে ছিল মাত্র ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৫ সাল শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ কোটি ৪ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে স্থানীয় ব্যবসার ধীরে ধীরে যুক্ত হওয়ার আভাস দেয়।
উদীয়মান আইনি চ্যালেঞ্জ:
রেকর্ড এই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির মধ্যেও আঙ্কটাড প্রতিবেদনে কিছু নতুন আইনি জটিলতার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ২০২৫ সালে অ্যাঙ্গোলা, মিয়ানমার ও সেনেগালের মতো সাতটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দায়ের করা আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধ বা ‘ইনভেস্টর-স্টেট ডিসপ্যুট সেটেলমেন্ট’ (ISDS) মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশকে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে ধরে রাখতে এই আইনি মধ্যস্থতা ও বিরোধগুলো স্বচ্ছতার সাথে মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।