উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে মন্দার মধ্যে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ২১% বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশ্লেষকরা; নেপথ্যে দুর্বল ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তর, অলস আমানত ও নতুন প্রভাবশালীদের উত্থানের ইঙ্গিত।
ঢাকা, ২৬ জুলাই (বিডিইকোনমি): ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে দেশে এক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৭ হাজারের বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ঐতিহাসিক মন্দার মধ্যেও কোটিপতি হিসাবের এই বিপুল বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে কোটি টাকার ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৬২৯টি। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৪৫টিতে। অর্থাৎ, ১৮ মাসে নতুন কোটি টাকার হিসাব যুক্ত হয়েছে ৭ হাজার ১৬টি, যা প্রায় ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
একই সময়ে এসব উচ্চমানের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মোট আমানতের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।
অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে কী?
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যে অল্প সময়ে কোটি টাকার হিসাব ২১ শতাংশ বাড়াকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই হঠাৎ প্রবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন খাতে নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকিং সিস্টেমে এসে থাকতে পারে, যা কোটি টাকার হিসাব বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করার পর অনেক আমানতকারী তাদের ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন। এর পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণীর উদ্ভব এবং ব্যাংকে নগদ টাকা রাখার প্রবণতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন ক্ষমতা বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ যখন নতুন গোষ্ঠীর হাতে যায়, তখন তার প্রভাব স্বভাবতই ব্যাংক হিসাবের পরিসংখ্যানে পড়ে।
বালিশের নিচে রাখা টাকা ব্যাংকে এসেছে?
অনেকে ধারণা করেছিলেন যে, ব্যাংকের বাইরে রাখা নগদ টাকা ব্যাংকিং সিস্টেমে ফেরার কারণে হয়তো কোটিপতি হিসাব বেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য এই ধারণাকে সমর্থন করে না। কারণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কমার বদলে বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঘরে রাখা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩,৫৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩,০১৮ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত স্থানান্তর এবং নতুন ব্যবসায়ী আভিজাত্যের উদ্ভব ছাড়াও, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ধীর হওয়ায় অনেক ধনী ব্যক্তি তাদের উদ্বৃত্ত টাকা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে না খাটিয়ে ব্যাংকের স্থায়ী আমানতেই রেখে দিচ্ছেন।
প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ১৬টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে নেমে আসায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অলস টাকা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি কঠোর করেছে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই প্রবৃদ্ধির আংশিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও, কোনো অবৈধ বা অপ্রদর্শিত অর্থের সংশ্লেষ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।