ঢাকা, ৩ জুন (বিডিইকোনমি ডটনেট) — দেশের প্রধান প্রধান খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের ধারাবাহিক মন্দা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পতন অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.০৯ শতাংশ কমেছে।
বুধবার (৩ জুন) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ রপ্তানি খাত থেকে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ (৪.৪০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার আয় করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৯ লাখ (৪.৭৩ বিলিয়ন) ডলার।
মে মাসের এই পতন চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসের (জুলাই-মে) সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জুলাই-মে মেয়াদে মোট রপ্তানি আয় ২.৫৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি (৪৩.৭৯ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি (৪৪.৯৪ বিলিয়ন) ডলার। সামগ্রিক এই পতন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতে বড় ধাক্কা
জাতীয় রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ দখল করে থাকা তৈরি পোশাক খাত এই মন্দায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৮.২৯ শতাংশ কমে ৩৫৯ কোটি ৪১ লাখ (৩.৫৯ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের মে মাসে ছিল ৩৯১ কোটি ৯০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার। অন্যদিকে, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই-মে) পুঞ্জীভূত হিসাবে আরএমজি খাতের আয় ৩.৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি (৩৫.৩১ বিলিয়ন) ডলারে নেমেছে, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৬৫৬ কোটি (৩৬.৫৬ বিলিয়ন) ডলার।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কিছু কাঠামোগত সমস্যার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। দেশের অভ্যন্তরে তীব্র জ্বালানি সংকট, গ্যাসের উচ্চ মূল্য এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি কারখানাগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপীয় দেশগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রেতাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং খুচরা বিক্রেতাদের গুদামে অবিক্রিত পণ্যের জট নতুন ক্রয়াদেশের গতি ধীর করে দিয়েছে।
মাসভিত্তিক পুনরুদ্ধার ও বহুমুখীকরণের ইতিবাচক ইঙ্গিত
বার্ষিক (বছরের একই মাসের তুলনায়) হিসাবে পতন হলেও, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে রপ্তানি আয়ে একটি শক্তিশালী ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেছে। এপ্রিল ২০২৬-এর ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ (৪.০ বিলিয়ন) ডলারের তুলনায় মে মাসে রপ্তানি আয় ৯.৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে পোশাক রপ্তানিতেও এপ্রিলের (৩১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার) তুলনায় মে মাসে ১৪.৪৩ শতাংশ মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
পাশাপাশি, দেশের রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টায় কিছু আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা গেছে। পোশাক খাতের বাইরে বেশ কিছু অপ্রচলিত বা অ-ঐতিহ্যবাহী খাত মে মাসে এবং সামগ্রিক ১১ মাসের পুঞ্জীভূত হিসাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
উন্নতির এই তালিকায় রয়েছে ওষুধ (ফার্মাসিউটিক্যালস), প্লাস্টিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, মুদ্রণ সামগ্রী, হোম টেক্সটাইল এবং প্রকৌশল পণ্য। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তাজা ফলমূল এবং কাঁকড়া রপ্তানিতেও অর্থবছরের এই ১১ মাসে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে; যা ইঙ্গিত করে যে প্রধান ইঞ্জিনটি কিছুটা মন্থর হলেও অন্যান্য বিকল্প খাতগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও নতুন বাজার সন্ধান
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ইউরোপের কিছু অংশে চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।
একই সাথে স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশ এবং নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবের মতো অ-ঐতিহ্যবাহী বাজারেও জুলাই-মে সময়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও সম্প্রসারণকে নির্দেশ করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাস সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। তবে মে মাসের শক্তিশালী মাসভিত্তিক পুনরুদ্ধার এবং অ-তৈরি পোশাক খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিচয় দেয়। আগামী অর্থবছরে এই ধারাকে টেকসই করতে হলে দেশীয় সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা দূর করা এবং চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি।