অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডি ইকোনমি
ঢাকা, ২ জুন ২০২৬ : আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ ধারী প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক এবং সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট (এফআইডি) এই সংক্রান্ত একটি বিশদ সার্কুলার জারি করে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে পাঠিয়েছে। এফআইডি-এর পরিচালক মো. ইকবাল মহসিন স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো—১০ টাকা, ৫০ টাকা ও ১০০ টাকার অ্যাকাউন্টধারী নিম্নআয়ের পেশাজীবী, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য চলমান পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের (Refinancing Scheme) আওতায় ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান ও সহজ করা।
সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) দেশের কৃষকদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজের আওতায় আনতে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা-২০২৫’ গ্রহণ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই পদক্ষেপটি সরকারের সেই নীতিমালার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ডধারী প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলা এবং এই বিশেষ তহবিলের আওতায় ঋণ প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দিতে হবে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ডিজিটাল ডেটাবেজের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটায় সরকারি কৃষি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকদের চেনা সহজ হবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, স্মার্ট কার্ডকে কোনোভাবেই যেন ঋণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বাধা হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। যেসব যোগ্য ও দরিদ্র কৃষক এখনো স্মার্ট কার্ড পাননি, তাদেরকে কোনোভাবেই এই ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
অতিবৃষ্টি ও হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক ও তীব্র গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফসল, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের পাকা বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর আসা এই আকস্মিক আর্থিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে এবং আগামী মৌসুমের ফসলের প্রস্তুতি নিতে কৃষকদের কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলারে বন্যায় ও অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হাওর জেলা—সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে পুনর্বাসন সহায়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র চাষিরাও এই সুবিধার আওতায় থাকবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ঋণ বিতরণে যেকোনো ধরনের বিলম্ব দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।
সাধারণত জামানত (Collateral) না থাকায় প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকেরা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পান না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমটি মূলত এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে কম সুদে এই তহবিল জোগান দেওয়ার মাধ্যমে খাতের ঝুঁকি নিজেই বহন করে, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণে উৎসাহিত করে।
নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল পরিচয়পত্রের সাথে কৃষিঋণের এই সংযুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীলতার তহবিল গঠন বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক। ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই নীতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।