মঙ্গলবার ২ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ:
ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত শতাধিক মে মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৫.৩৪ শতাংশের বিশাল প্রবৃদ্ধি; চলতি অর্থবছরে এসেছে ৩২.৭৫ বিলিয়ন ডলার রাস্তায় আন্দোলন করে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানকে সরানো যাবে না: বাংলাদেশ ব্যাংক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশজুড়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত আইএমএফের সঙ্গে নতুন ৪০০-৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাতিল হচ্ছে চলমান তহবিল আগামী ২০২৬-২৭: বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মুনাফাসহ পূর্ণ টাকা ফেরত চান ৬ এনবিএফআইয়ের আমানতকারীরা; শুধু মূলধন ফেরতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান অর্থনীতিতে গতি আনতে ও ২৫ লাখ কর্মসংস্থানের টার্গেটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা আস্থা হারানো ইসলামী ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের লড়াই এবং ওমর ফারুক খানের নেতৃত্বের গল্প

ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত শতাধিক

ঢাকা, ১ জুন (বিডিইকোনমি.নেট) — বেসরকারি খাতের বৃহৎ ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-র নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজধানীর দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় এক নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১ জুন) সকালে ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে পুলিশ বাধা দিলে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যাতে ১০ জন পুলিশ সদস্যসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ব্যাংকের বোর্ড মিটিং ছাড়াই সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে এবং সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বিতর্কিত ‘এস আলম গ্রুপ’-এর দোসরদের ব্যাংকটিতে পুনর্বাসনের একটি অপচেষ্টা।

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জের পাশাপাশি ব্যাপক হারে জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষ চলাকালে অন্তত ৩০ জন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে আয়োজকেরা দাবি করলেও, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গুলি চালানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি যেভাবে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’ এবং ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে শত শত আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ গ্রাহক ভোর ৬টা থেকেই মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। তারা নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ এবং সম্প্রতি বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলার (নথিভেদে ওমর ফারুক খান) স্বপদে বহালের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দাঙ্গা গিয়ার ও জলকামানসহ পুলিশের একটি বড় দল আন্দোলনকারীদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলে উত্তেজনার পারদ চড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত লাঠিচার্জ শুরু করে এবং জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে পুরো দিলকুশা ও মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং চারদিকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশের এই অ্যাকশনে পুরো এলাকার শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।

হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নূরনবী মানিক বলেন, “পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসররা যাতে আমাদের কষ্টার্জিত আমানত আবার লুটপাট করতে না পারে, সেজন্য আমরা একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের আয়োজন করেছিলাম। সাধারণ নাগরিকদের ওপর পুলিশের এই উস্কানিমূলক ও বর্বরোচিত হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে চরম তারল্য সংকটে ভুগছে। সাধারণ গ্রাহকেরা চেক দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারছেন না এবং এটিএম বুথগুলোও টাকাশূন্য হয়ে পড়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে এস আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খুরশীদ আলমের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করে প্রকৃত অংশীজনদের নিয়ে নতুন বোর্ড গঠনের দাবি জানান তিনি।

ঐতিহাসিক এই সংঘর্ষের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার এলাকা অবরুদ্ধ বা কর্ডন করে রাখে। ফলে দিনভর সাধারণ গ্রাহক তো বটেই, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ভেতরে প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।

গুলি চালানোর দাবি ডিএমপির প্রত্যাখ্যান: যোগাযোগ করা হলে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস) এনএম নাসিরুদ্দিন ইউএনবি-কে বলেন, আন্দোলনকারীরা মতিঝিলের প্রধান সড়কগুলো অবরোধ করে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি হয়।

তিনি বলেন, “চাকরিচ্যুত একদল ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা সমাবেশের অনুমতির জন্য আবেদন করেছিলেন, যা ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে নাকচ করা হয়। অন্যদিকে, গ্রাহকদের এই গ্রুপটি কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই রাস্তায় বসে পড়েছিল।”

ডিএমপির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, পুলিশ কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আত্মরক্ষার্থে টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। আন্দোলনকারীদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারসহ (পেট্রোল) অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

অন্তত ৩০ জন গ্রাহকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের গুলি বা লাইভ রাউন্ড ফায়ার করা হয়নি। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংঘর্ষে আহতদের উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।