বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ:
রপ্তানি বাড়ছে, ভরসা এখনো পোশাকে—বৈচিত্র্যের নতুন ইঞ্জিন কি তৈরি হচ্ছে?<gwmw style="display:none;"></gwmw> তৃতীয় দফায় ৪ অক্টোবর ৭,৬৪১ গ্রাহককে ২৬.৩৭ কোটি টাকা দিচ্ছে আইডিআরএ<gwmw style="display:none;"></gwmw> ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৫ লাখ টেস্ট কিট দিল যুক্তরাষ্ট্র জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩ শতাংশ, এসেছে ৮.৫৭ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমলেও নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে প্রথম প্রান্তিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআরে দৈনিক লেনদেন ৫ গুণ বেড়ে ১৪৩.৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত, ১ অক্টোবর থেকে মিলবে নতুন সুবিধা: বাংলাদেশ ব্যাংক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফল ২০২৬ সেমিস্টারের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকে মাসব্যাপী সাইবার সিকিউরিটি সচেতনতা ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন

রপ্তানি বাড়ছে, ভরসা এখনো পোশাকে—বৈচিত্র্যের নতুন ইঞ্জিন কি তৈরি হচ্ছে?

প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়েছে ৭৮১ মিলিয়ন ডলার; একাই প্রায় ৭৮ শতাংশ অবদান RMG-এর

ঢাকা, ১ অক্টোবর (বিডিইকোনমি): চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১৩ দশমিক ০৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ১২ দশমিক ৩১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭৮১ মিলিয়ন ডলার।

তবে এই প্রবৃদ্ধির দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য বাড়ার কিছু লক্ষণ তৈরি হলেও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি এখনো তৈরি পোশাক (RMG) খাতই। প্রথম প্রান্তিকে RMG থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০ দশমিক ৫৭৮ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯ দশমিক ৯৭০ বিলিয়ন ডলার। ফলে খাতটির আয় বেড়েছে প্রায় ৬০৮ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশই এসেছে RMG খাত থেকে। বিপরীতে RMG-এর বাইরে থাকা সব খাত মিলিয়ে নিট রপ্তানি বৃদ্ধির অবদান প্রায় ২২ দশমিক ১ শতাংশ।

এ হিসাব বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—পোশাকনির্ভরতা কিছুটা কমানোর লক্ষণ দেখা গেলেও সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনো মূলত পোশাকের ওপর নির্ভরশীল।

RMG-এর আধিপত্য, তবে অংশীদারিত্ব সামান্য কমেছে

প্রথম প্রান্তিকে মোট পণ্য রপ্তানিতে RMG-এর অংশ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ অংশ ছিল প্রায় ৮১ শতাংশ।

অর্থাৎ এক বছরে RMG-এর অংশ খুব বেশি না কমলেও সামান্য হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে অন্যান্য পণ্যের সম্মিলিত অংশ প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

এটি রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও পরিবর্তনের গতি এখনো সীমিত। কারণ মোট রপ্তানি আয়ের প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে প্রায় ৮১ ডলার এখনো তৈরি পোশাক থেকে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, FY26-এর প্রথম ১১ মাসে মোট রপ্তানিতে RMG-এর অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল এবং ওই সময়ে পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়াই সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে চাপ তৈরির অন্যতম কারণ ছিল।

নিট ও ওভেন—দুই উপখাতেই প্রবৃদ্ধি

RMG-এর ভেতরেও প্রবৃদ্ধি এসেছে দুই প্রধান উপখাত থেকে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৯৬৩ বিলিয়ন ডলারে এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৬১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ RMG-এর প্রবৃদ্ধি কোনো একটি উপখাতনির্ভর নয়; নিট ও ওভেন—উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানি বেড়েছে। আগস্ট মাসেও উভয় উপখাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।

RMG-এর বাইরে নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো কয়েকটি অপ্রচলিত খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি।

প্রথম প্রান্তিকে ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতে প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হয়ে ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইলের ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

অর্থাৎ তৈরি পোশাকের বাইরে পাট, ওষুধ, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য ও হোম টেক্সটাইল—একাধিক খাত একই সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। আগস্টের রপ্তানি তথ্যেও পাট, ওষুধ, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য ও জুতাসহ বেশ কয়েকটি অ-RMG খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

তবে বৈচিত্র্য এখনো ‘গতি’ পেয়েছে, ‘গভীরতা’ নয়

এখানেই বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়েছে।

অপ্রচলিত কয়েকটি খাত দ্রুত বাড়ছে—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু মোট রপ্তানির আকারের তুলনায় এসব খাত এখনো ছোট। ফলে কোনো একটি খাতে ৩০-৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও তার প্রভাব মোট রপ্তানিতে RMG-এর কয়েক শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান হয় না।

ওষুধ খাতের ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিংবা পাট খাতের ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি তাই রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের শক্তিশালী সম্ভাবনা দেখালেও, সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর তাদের প্রভাব এখনো সীমিত।

এটি বোঝা যায় মোট রপ্তানি বৃদ্ধির হিসাব থেকেই। প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ৭৮১ মিলিয়ন ডলার; এর মধ্যে RMG একাই যোগ করেছে প্রায় ৬০৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অন্যান্য খাতগুলোর সম্মিলিত নিট অবদান এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট।

কৃষি ও মৎস্যপণ্যে দুর্বলতা

রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের পথে কিছু দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। প্রথম তিন মাসে কৃষিপণ্য এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ছিল।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্য শুধু শিল্পপণ্যের নতুন বাজার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, মৎস্য, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতকে আন্তর্জাতিক মূল্যশৃঙ্খলে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়াও এর অংশ।

বাজারেও বৈচিত্র্য আসছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান

পণ্য বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বাজার বৈচিত্র্যেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ২ দশমিক ৫৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।

যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৩৭০ বিলিয়ন এবং জার্মানিতে ১ দশমিক ২১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্ক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২১০ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—প্রবৃদ্ধি ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ।

এর ফলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা শুধু প্রচলিত পশ্চিমা বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; তুরস্কসহ নতুন বাজারেও চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে।

সামনে মূল চ্যালেঞ্জ—RMG-এর বাইরে বড় রপ্তানি খাত তৈরি

সামগ্রিক চিত্র বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখন একটি ‘সংক্রমণ পর্যায়ে’ রয়েছে। একদিকে RMG এখনো প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি, অন্যদিকে ওষুধ, পাট, চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও হোম টেক্সটাইলের মতো খাতে তুলনামূলক দ্রুত প্রবৃদ্ধি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কিন্তু প্রকৃত অর্থে রপ্তানি বৈচিত্র্য অর্জন করতে হলে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার যথেষ্ট নয়; এসব খাতকে বড় আকারের রপ্তানি সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ নতুন খাতের প্রবৃদ্ধি থেকে স্কেল বা ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতায় যেতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষি ও মৎস্যপণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কাটিয়ে ওঠা, পণ্যের মান ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং জোরদার করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বিডিইকোনমি বিশ্লেষণ

প্রথম প্রান্তিকের রপ্তানি তথ্য তাই দ্বৈত বার্তা দিচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান ভরসা এখনো RMG; দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির জন্য সম্ভাবনার জায়গাটি তৈরি হচ্ছে RMG-এর বাইরের খাতগুলোতে।

প্রথম প্রান্তিকে মোট রপ্তানি ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়লেও RMG-এর অংশ প্রায় ৮১ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়—রপ্তানি আয়ের কাঠামোকে আরও বহুমুখী করা।

ওষুধ, পাট, চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও হোম টেক্সটাইলের বর্তমান প্রবৃদ্ধি সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বড় রপ্তানি আয়ে রূপান্তর করতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, মাননিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন।

অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি গল্প এখন আর শুধু ‘গার্মেন্টস কত বাড়ল’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরবর্তী বড় প্রশ্ন হলো, RMG-এর বাইরে কতগুলো খাত বড় রপ্তানি ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে।