ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর (বিডিইকোনমি): দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি (Monetary Policy Statement – MPS) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে মূল নীতি সুদহার (পলিসি রেট) ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তানুসারে ষান্মাসিক (ছয় মাস পরপর) ব্যবস্থার পরিবর্তে এবারই প্রথম তিন মাস মেয়াদী বা ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি কাঠামো চালু করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।
ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, ওভারনাইট রেপো বা নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদের হার ১১.০০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদের হার ৭.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ঋণপ্রবাহের চিত্র তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সংকুচিত মুদ্রানীতির কারণে ঋণের উচ্চ সুদের হার, তার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে। দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদা, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশে।
তবে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান আশা প্রকাশ করেন, বাজারে তরলতার (লিকুইডিটি) সমন্বয় ঘটায় আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হবে।
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পেছনে যুক্ত ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এই মুহূর্তে সময়ের আগেই মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে তা পুনরায় মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। ২০২৬ সালের আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮.২৬ শতাংশে নেমে এসেছে—যার মূলে রয়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশে নেমে আসা। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯.৩২ শতাংশের উচ্চতায় রয়েছে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, সম্প্রতি স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য রাজস্ব চাপের কারণে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচক তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, অর্থবছর ২৫-এ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আনুমানিক ৪.১৪ শতাংশ, যদিও অর্থবছর ২৬-এর তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমে ২.২ শতাংশে নেমে আসে এবং শিল্প উৎপাদনে ০.২৮ শতাংশ সংকোচন ঘটে। নতুন অর্থবছর ২৭-এর জন্য বিশ্বব্যাংক ৪.৬ শতাংশ এবং আইএমএফ প্রাক্কলন সংশোধন করে ৩.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এর মধ্যে বন্ধ কারখানা চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি সিএমএসএমই, কৃষি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু রয়েছে।
বৈদেশিক খাতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, অর্থবছর ২৭-এর শুরুতে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) ১৮.৯০ শতাংশের জোরালো প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীল বিনিময় হার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে, যা আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে বড় ভূমিকা রাখছে।