নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সত্তরের দশকের শেষভাগ। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে শিল্পায়ন ছিল স্বপ্নাতীত, কর্মসংস্থান ছিল কেবল কৃষি-নির্ভর। সেই কঠিন সময়ে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ পাস হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় এক নতুন অভিযাত্রা। ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)
আজ তার সাফল্যের ৪৫ বছর পূর্ণ করে পা রাখছে ৪৬তম বছরে। সাফল্যের এই সাড়ে চার দশকে বেপজা কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক আস্থার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
ক্ষুদ্র জমিতে বিশাল অবদানবেপজার সাফল্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ভূমির ব্যবহার। বেপজার অধীনে পরিচালিত ৮টি ইপিজেড এবং নবনির্মিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট আয়তন মাত্র ৩,৫৫০ একর, যা বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র ০.০০১ শতাংশেরও কম। অথচ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু থেকেই আসছে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসেবে দেখা যায়, জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান ছিল ১৭.০৩ শতাংশ এবং মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) প্রায় ১৯.৪৭ শতাংশ।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বাতিঘরগত ৪৫ বছরে বেপজা ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং রপ্তানি করেছে ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য। কিন্তু বেপজার অবদান কেবল ডলারের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৫.৫ লাখ মানুষের, যার একটি বিশাল অংশ নারী। পরোক্ষভাবে প্রায় ২১ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই ইপিজেডগুলোর সঙ্গে। ইপিজেডের প্রতি একর জমি থেকে প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে ১৩.৮২ কোটি টাকা।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং ও বৈচিত্রায়নএক সময় ইপিজেড মানেই ছিল তৈরি পোশাক কারখানা। কিন্তু বেপজা এখন সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। বর্তমানে বেপজাধীন কারখানার মাত্র ৩২ শতাংশ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে। বাকি ৬৮ শতাংশ কারখানায় তৈরি হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ড্রোন, ক্যামেরা লেন্স, অলিম্পিকে ব্যবহৃত বাইসাইকেল, বিশ্ব আর্চারি প্রতিযোগিতার তীর এবং চশমার ফ্রেমের মতো উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য। মীরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ড্রোন কারখানা, যা বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নসবুজ শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও বেপজা আজ গ্লোবাল লিডার। দেশের প্রথম লিড (LEED) প্লাটিনাম সার্টিফাইড কারখানা গড়ে উঠেছিল ঈশ্বরদী ইপিজেডে। বর্তমানে বেপজাধীন জোনে ২৭টি লিড সার্টিফাইড কারখানা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে মেটানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার (CETP) এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করছে বেপজা।
শ্রমিক কল্যাণ ও সুরক্ষাবেপজার আরেকটি সাফল্যের জায়গা হলো শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক। ইপিজেডের শ্রমিকরা সাধারণ কারখানার তুলনায় গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ বেশি মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ‘বেপজা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল এবং যেকোনো সমস্যায় দ্রুত প্রতিকারের জন্য ‘১৬১২৮’ হেল্পলাইন চালুর মাধ্যমে শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
আগামীর পথচলাসাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখতে যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন দুটি ইপিজেড স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই এগুলোতে প্লট বরাদ্দ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া রংপুর ও সিরাজগঞ্জে আরও দুটি ইপিজেড স্থাপনের প্রস্তাবনা রয়েছে।
৪৬ বছরে পদার্পণ করা বেপজা আজ একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন সারথি। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে বেপজার এই অগ্রযাত্রা আগামী দিনে আরও বেগবান হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
এক নজরে বেপজা:
প্রতিষ্ঠা:১৫ এপ্রিল, ১৯৮১
মোট বিনিয়োগ: ৭.২৯ বিলিয়ন ডলার
মোট রপ্তানি: ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি
কর্মসংস্থান: ৫.৫ লাখ (সরাসরি)
জমির অবদান: প্রতি একরে বার্ষিক রিটার্ন ১৩.৮২ কোটি টাকা
জাতীয় রপ্তানিতে অবদান: ১৭.০৩% (২০২৪-২৫)