ঢাকা, ১৭ জুন (বিডিইকোনমি ডটনেট) : বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন’ পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে পরিবহন শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের চালকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই প্রক্রিয়ায় কেউ পিছিয়ে না পড়ে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর ‘আলোকি কনভেনশন সেন্টারে’ আয়োজিত এক জাতীয় যুব সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন অনুবিভাগ) মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ এই মন্তব্য করেন। বুধবার (১৭ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইউথনেট গ্লোবাল (YouthNet Global) এবং ফ্রিডরিশ-এবার্ট-স্টিফটুং (FES) বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘জাস্ট ট্রানজিশন অ্যান্ড সাসটেইনেবল আরবান মোবিলিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই ‘জাতীয় যুব সম্মেলন’-এর আয়োজন করে। সম্মেলনে যুব নেতা, নীতি-নির্ধারক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ এবং ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৫০ জন অংশ নেন।
সমাপনী অধিবেশনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার যোগ দিয়ে জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতি ইইউ-এর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে বাংলাদেশকে একটি ন্যায়সংগত, দক্ষ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপান্তরের যাত্রায় একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে দ্রুত নগরায়ণ ও তীব্র যানজট, অন্যদিকে বায়ুর গুণমান হ্রাস এবং গণপরিবহনে অসম প্রবেশাধিকার দেশের টেকসই উন্নয়নের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। প্রথাগত পরিবহন ব্যবস্থার এই নেতিবাচক প্রভাব দূর করতে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে হবে, তবে একই সাথে এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
দেশে গ্রিন মোবিলিটির অগ্রগতি তুলে ধরে অতিরিক্ত সচিব বলেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে লাখ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার (ইজি বাইক) চলাচল করছে। তবে এই রূপান্তরকে শতভাগ পরিবেশবান্ধব করতে হলে পরিচ্ছন্ন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, শক্তিশালী চার্জিং অবকাঠামো এবং পরিবেশসম্মত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “একটি রূপান্তর তখনই সত্যিকার অর্থে ‘সবুজ’ বা ‘গ্রিন’ হবে, যখন এটি একই সাথে নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন হবে।” অনিরাপদ উপায়ে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার (Recycling) পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে বক্তারা পরিবহন খাতের সংস্কারের সাথে জনস্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বায়ুদূষণ বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিশু ও শ্রমজীবীসহ প্রান্তিক মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।
অতিরিক্ত সচিব নাভিদ শফিউল্লাহ আরও বলেন, “পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে টেকসই নগর পরিবহন কেবল যাতায়াতের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সাথেও জড়িত। যখন একজন স্বল্প আয়ের কর্মী, একজন নারী কিংবা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তখন মূলত তাদের মর্যাদা ও সুযোগকেই অস্বীকার করা হয়।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি ন্যায়সংগত পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের জন্য পরিবহন শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির ওপর পুনরায় দক্ষ করে তোলা (Reskilling), অনানুষ্ঠানিক চালকদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া কপ-৩১ (COP31) সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা এবং এনডিসি ৩.০ (NDC 3.0) বাস্তবায়নে তরুণদের সম্পৃক্ততা ও সামাজিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
ইউথনেট গ্লোবালের এক্সিকিউটিভ কো-অর্ডিনেটর সোহানুর রহমান জলবায়ু ও পরিবহন খাতের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের মূল ভূমিকায় রাখার আহ্বান জানান।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে এফইএস (FES) বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি ড. ফেলিক্স গার্ডেস শহরাঞ্চলের পরিবহন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকল অংশীজনের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ এবং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সম্মেলন শেষে অংশগ্রহণকারীরা তরুণদের পক্ষ থেকে একটি নীতি-সুপারিশমালা গ্রহণ করেন। এতে পরিচ্ছন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থা, শ্রমিকদের শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, সবুজ কর্মসংস্থান (Green Jobs) বৃদ্ধি, বায়ুর গুণমান উন্নয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।