ঢাকা, জুলাই (বিডিইকোনমি) — পাওনা অর্থ পরিশোধ নিয়ে বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সাথে প্রায় ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বকেয়া বিরোধের জেরে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ক্রয় ও নতুন অর্ডার স্থগিত করেছে পোল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন রিটেইল জায়ান্ট ‘এলপিপি এসএ’ (LPP SA)। জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘রিজার্ভড’ (Reserved), ‘ক্রপ’ (Cropp) এবং ‘সিনসে’ (Sinsay)-এর মালিক কোম্পানি এটি।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ও বিজিএমইএ (BGMEA) সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরবরাহকারীদের বারবার বকেয়া অর্থ প্রদানে বিলম্ব, পণ্য পৌঁছানোর পর অনুচিত ছাড় (ডিসকাউন্ট) দাবি এবং দীর্ঘদিনের পাওনা অনাদায়ী রাখা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে পোলিশ এই ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নতুন কাজের আদেশ স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলপিপি এসএ-র কাছে ইতিমধ্যেই প্রস্তুত ও শিপমেন্ট হওয়া পণ্যের প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার পাওনা আটকে থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে বেশ কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানা ও বাইং হাউস। পোশাক প্রস্তুতকারকদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী অর্থ না দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দাম কমানো ও পেমেন্টে বিলম্ব করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের দাবি—পণ্যের গুণগত মান সংক্রান্ত ত্রুটি, সময়মতো পণ্য না পৌঁছানো এবং বৈশ্বিক খুচরা বাজারের মন্দার কারণে এই অর্থ প্রদানে বিলম্ব হয়েছে।
বিরোধ নিরসনে কারখানা মালিক ও এলপিপি এসএ-র প্রতিনিধিদের সাথে মধ্যস্থতা ও আলোচনা চালায় বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। তবে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তিতে আলোচনা থমকে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাজার থেকে সাময়িকভাবে কার্যক্রম গুটানোর সিদ্ধান্ত নেয় এলপিপি এসএ।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বাজারে দ্রুত প্রসারমান এই পোলিশ ব্র্যান্ডটি প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক সংগ্রহ করতো। ফলে হঠাৎ করে তাদের কেনাকাটা বন্ধের ঘোষণা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, “এ ধরনের বড় মাপের বকেয়া বিরোধ স্থানীয় কারখানাগুলোর পরিচালনা কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন ঘটায়, যা সরাসরি কারখানার ক্যাশ-ফ্লো, কাঁচামাল ক্রয় এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
তিনি আরও জানান, বকেয়া অর্থ উদ্ধার এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বিজিএমইএ বাণিজ্য কর্মকর্তা, আইনি উপদেষ্টা এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। পোলিশ ব্র্যান্ডটির আদেশ স্থগিতের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, “তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা চালিয়ে যাবে কি না, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যবসার বিষয়। তবে তারা যদি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে আমরা বাংলাদেশে কোম্পানিটিকে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ (কালো তালিকাভুক্ত) করার পদক্ষেপ নেব।”
তিনি আরও জানান, এলপিপি-র এই অপেশাদার আচরণের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গ্লোবাল বায়ার্স ফোরাম এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরবে বিকেএমইএ।