ঢাকা, ২৯ জুলাই (বিডিইকোনমি ডটনেট)- দেশের অভ্যন্তরে নৌপথ ও নৌবাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করতে সারা দেশের খালগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, এমপি। তিনি জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের একটি মেগা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত “বাংলাদেশে খাল খনন: বৃত্তাকার নৌপথ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সড়কের চেয়ে নৌপথে পরিবহন খরচ ৫৫-৬০% কম:
সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি জানান, বহু বছরের অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত দখল ও পলি জমার কারণে দেশের ৫৫ শতাংশেরও বেশি নদী ও খাল তাদের নাব্য হারিয়েছে। ফলে দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ৭৭ শতাংশই বর্তমানে সড়কপথে সম্পাদিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
ডিসিসিআই সভাপতি উল্লেখ করেন, নৌপথে পণ্য পরিবহনে খরচ সড়কপথের তুলনায় প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কম এবং জ্বালানি দক্ষতা ৪ থেকে ৬ গুণ বেশি। এটি ব্যবসা পরিচালনা খরচ (Cost of Doing Business) উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। ঢাকার চারপাশের চার নদীকে যুক্ত করা ১১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার নৌপথকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের কঠোর অবস্থান:
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, সরকারের খাল খনন কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি চারা রোপণের একটি বিশাল কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী নিশ্চিত করেন, ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সাশ্রয়ী মূল্যে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্যানেল আলোচকদের সুপারিশ:
সেমিনারে আমন্ত্রিত প্যানেল আলোচকরা নদী ও খাল রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন:
- আর্কিটেক্ট ইকবাল হাবিব (প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার, ভিটি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেড): নৌপথে কম উচ্চতার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ বন্ধের দাবি জানান। নদী ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রায় ১৫টি সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি একক ‘লিড এজেন্সি’ গঠন এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
- অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ হোসেন (আইডব্লিউএফএম, বুয়েট): বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাজের ওভারল্যাপিং ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করতে প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণের ওপর জোর দেন।
- এমডি তানিম সারোয়ার (আইডব্লিউএম): জিপিএস ও আধুনিক জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ ও প্রবাহ পর্যবেক্ষণের তাগিদ দেন।
- মো. মোতালেব হোসেন সরকার (ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, সিইজিআইএস): একটি কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনা কমিশন গঠনের পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রস্তাব করেন।
- কাজী গোলাম নাসির (সাবেক প্রধান স্থপতি): নদীর পানিকে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ বিবেচনা করে সমন্বিত পদক্ষেপে নদী রক্ষায় সব সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমেদ, সাবেক সহ-সভাপতি এম আবু হুরায়রা বুড়িগঙ্গা নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দাবি জানান। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালেম সুলাইমানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।