ঢাকা, ১ জুলাই (বিডিইকোনমি) — সরকারের নীতিগত ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি আর্থিক সহায়তায় বড় ধরনের বিপর্যয় কাটিয়ে অবশেষে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’।
কয়েক সপ্তাহ ধরে নজিরবিহীন তারল্য ও আস্থা সংকটে থাকা ব্যাংকটিতে এখন আমানতকারীদের আতঙ্ক কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যাংকিং ও সাধারণ লেনদেন কার্যক্রমও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
যে ঘোষণায় কাটলো বড় মেঘ:
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকসহ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা নিয়ে। এই ধারার সুযোগ নিয়ে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপসহ আগের মালিকদের আবারও মালিকানায় ফেরার একটি আইনি পথ খোলা ছিল।
তবে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার এই বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিকরা আর ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসতে পারবেন না।” সরকারের এই একটি ঘোষণাই মূলত গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং এস আলমের ফেরার পথ বন্ধ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা:
আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি ব্যাংকটির নগদ টাকার সংকট মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বাজারে অনেক বেশি গুজব বা অনুমান তৈরি হয়েছিল। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী এটি পরিচালিত হবে এবং প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই আর্থিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল সংকট:
গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এর বিরুদ্ধে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ আন্দোলনে নামে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু বক্তব্যে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালে ব্যাংক থেকে হুড়মুড় করে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের পে-অর্ডার নিচ্ছিল না, আরটিজিএস (RTGS) লেনদেন অচল হয়ে পড়ে এবং শাখাগুলো থেকে গ্রাহকদের এক লাখ টাকার বেশি উত্তোলন সীমিত করে দেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও তদারকি:
সংকট গভীর হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিতর্কিত চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে চেয়ারম্যান এবং আশরাফুল আলমকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে আতঙ্ক কেটে যাওয়ায় নতুন আমানত বাড়ছে এবং টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। এখন অনেক শাখা থেকেই গ্রাহকেরা কোনো বাধা ছাড়াই এক থেকে দুই লাখ বা তারও বেশি টাকা তুলতে পারছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের চ্যালেঞ্জ:
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িক তারল্য সহায়তায় সংকট কাটলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। ব্যাংকটিকে পুরোপুরি শৃঙ্খলায় ফেরাতে হলে—
- খেলাপি ঋণ দ্রুত পুনরুদ্ধার করা,
- বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা,
- ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং
- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুতই সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে।