ঢাকা, ১৭ জুন (বিডিইকোনমি ডটনেট) : সরকার ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট কেবল প্রথাগত আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং তা মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত । তবে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর সঙ্গে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল রয়েছে, যা এর বাস্তবায়নকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে ।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর ইআরএফ অডিটোরিয়ামে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওআইআরডি)-এর উদ্যোগে আয়োজিত “প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ” শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন ।
সেমিনারে বক্তারা প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা, উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন । একই সঙ্গে তাঁরা বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ওপর জোর দেন ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ওআইআরডি-র চেয়ারম্যান ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব । স্বাগত বক্তব্য দেন ওআইআরডি-র নির্বাহী পরিচালক এবং সিটি ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. জুলফিকার হাসান ।
বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব ও ঋণনির্ভর
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওআইআরডি ফেলো এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স এন্ড ম্যানেজমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ড. যোবায়ের আহমেদ । তিনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ থেকে এক লাফে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন । এনবিআর-এর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে অতীত বাস্তবতার পরিপন্থী উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে দেশের ওপর ঋণের চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বাজেট জনকল্যাণের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থকেন্দ্রিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে না পৌঁছালে তা দুর্নীতি ও দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করবে । ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বাজেটে বেকারত্ব দূরীকরণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় সমালোচনা করেন এবং পরিকল্পিত লুটপাট ও অলিগার্কিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকিং খাত ক্রমান্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ।
বড় বাজেট মানেই ভালো বাজেট নয়
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ফুয়াদ বলেন, নতুন বাজেট পাসের আগে বিগত বছরের ব্যয়ের সঠিক হিসাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যথায় বাজেটের বড় অংশ দুর্নীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পকেটে চলে যায় ।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, বিগত ৫০ বছরের ইতিহাস বলছে বাজেটের আকার ক্রমাগত বেড়েছে, কিন্তু বড় বাজেট মানেই ভালো বাজেট—এই ধারণা সঠিক নয় । ব্যয়ভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কারণে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বাজেটে কম গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা করে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন ও উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানান । ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের সঠিক প্রবাহ ও অপচয় রোধে প্রতিটি সেক্টরে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ দেন ।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, বাজেটটি বাহ্যিকভাবে জনপ্রিয় মনে হলেও অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য রয়েছে । বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন করে তুলবে ।
সংকটের মূলে নৈতিকতার অবক্ষয়
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় এবং জবাবদিহিতার তীব্র অভাব । দুর্নীতি কেবল রাজনীতিবিদ বা আমলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের অভাব থাকলেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের প্রবণতা তৈরি হয় । তিনি বাজেটকে কেবল সংখ্যার চাতুর্যপূর্ণ হিসাব না বানিয়ে জনগণের প্রকৃত কল্যাণ, জাতীয় স্বার্থ এবং জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে বাস্তবায়নের জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান ।