আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ বিশ্বকে এক ভয়াবহ তৃতীয় মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বসহ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শীর্ষ নেতৃত্ব হারাল ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, অভিযানের প্রথম ধাপেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, চিফ অব স্টাফ এবং আইআরজিসি (IRGC)-এর কমান্ডারসহ অন্তত ৪৮ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন। এই হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ইরান এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। তেহরান থেকে ইসরায়েলসহ জর্ডান, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন এবং ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে হাইপারসোনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর হামলার অজুহাতে ইসরায়েল লেবাননের অভ্যন্তরে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করেছে।
জ্বালানি সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতি ইরানের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগার এবং কাতারের এলএনজি (LNG) স্থাপনায় হামলার পর কাতার গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করেছে। এর ফলে ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম একলাফে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। হরমুজ প্রণালীতে শুরু হয়েছে নতুন এক ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনী তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভক্তি বিদেশে যুদ্ধ চললেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে জনমত ট্রাম্প প্রশাসনের বিপক্ষে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের পক্ষে। সিনেটর এড মার্কির মতো ডেমোক্র্যাট নেতারা এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ এবং ‘পরিকল্পনাহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, ব্যক্তিগত আইনি কেলেঙ্কারি থেকে নজর সরাতেই ট্রাম্প এই বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছেন।
তুরস্ক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এই ঘটনাকে ‘নেতানিয়াহুর উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ইরান আমাদের প্রতিবেশী ও ভাই, এই আগুন নেভানো না গেলে পুরো অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাবে।” চীন ও রাশিয়াও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চীন দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও পাঁচটি সম্ভাবনা বিশ্লেষকরা এই যুদ্ধের পাঁচটি সম্ভাব্য পরিনতি দেখছেন: ১. জনবিক্ষোভের মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন। ২. পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া। ৩. ক্যাস্পিয়ান অঞ্চলের জ্বালানি যুদ্ধ এবং রাশিয়ার নতুন বাজার দখল। ৪. আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাসবাদের উত্থান। ৫. মার্কিন স্থল সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিরতা ও শরণার্থী সংকট।
বর্তমানে পুরো বিশ্ব উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে, এই সংঘাত কি আসলেই একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আর্মাগেডন’ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয় কি না।