অর্থনীতি ডেস্ক (বিডি ইকোনমি): দেশের আর্থিক লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে একটি আধুনিক ও ক্যাশলেস (নগদবিহীন) অর্থনীতি গড়ে তুলতে আগামী ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে সারা দেশে অভিন্ন ও ইন্টারঅপারেবল কুইক রেসপন্স কোড বা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক ক্যাম্পেইন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
দিনব্যাপী এই সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর-১ নূরুন নাহার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান এবং ডেপুটি গভর্নর মোঃ কবির আহমেদ খান। এছাড়াও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান (মোঃ মোস্তাকুর রহমান) উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার বলেন, “নগদ লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতেই বাংলা কিউআর চালুর এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, এর মাধ্যমে খুচরা গ্রাহকরা কোনো ধরনের খুচরা টাকা বহন করা বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝামেলা ছাড়াই নির্ধারিত ও সঠিক বিলের মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন, যা দৈনন্দিন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সুরক্ষিত করবে।
আরেক বিশেষ অতিথি ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে নথিবদ্ধ হওয়ায় দেশের অনানুষ্ঠানিক বা অনথিভুক্ত অর্থনীতির আকার কমে আসবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে দেশের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (GDP) আকার বাড়বে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে এবং যত বেশি মানুষ এই ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেমে যুক্ত হবে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হবে। ড. হাবিবুর রহমান দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ও পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের তাদের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে সরাসরি বাংলা কিউআর সুবিধা সংযুক্ত করার আহ্বান জানান, যাতে সাধারণ নাগরিক এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ব্যবসায়ীরা সহজে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা পেতে পারেন।
অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ বলেন, দেশের সিংহভাগ খুচরা লেনদেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে আসলে তা জাতীয় কর-জিডিপি (Tax-GDP) অনুপাতকে নাটকীয়ভাবে উন্নত করবে। এই আনুষ্ঠানিকতার ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে, যা জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি ত্বরান্বিত করবে।
তিনি আরও প্রকাশ করেন যে, আগামী বছর দেশে একটি সম্পূর্ণ ইন্টারঅপারেবল ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইপিএস) চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি কার্যকর হলে যেকোনো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ওয়ালেট থেকে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে এবং ব্যাংক হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এমএফএস ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে। কবির আহমেদ বলেন, “ডিজিটাল লেনদেনের প্রতিটি ধাপ একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল ট্রেইল বা ফুটপ্রিন্ট রেখে যায়।” এর ফলে রিয়েল-টাইমে অর্থের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে এবং এটি দেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিউনিকেশনস অ্যান্ড পাবলিকেশনস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হলো দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থার কার্যকারিতা সরাসরি প্রদর্শন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো।
ক্যাম্পেইনে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি এফএমসিজি (FMCG) ও খুচরা বিক্রেতা মেগা-ব্র্যান্ড অংশ নেয়। ব্যাংক প্রাঙ্গণে স্থাপিত অস্থায়ী স্টলগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে কেনাকাটা ও বিভিন্ন বিল পরিশোধের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল— ইউনিলিভার বাংলাদেশ, আগোরা (রহিমআফরোজ), মীনা বাজার, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন), ইউনিমার্ট, সেভয় আইসক্রিম, আরএফএল গ্রুপ এবং এমআর. ডিআইওয়াই (MR. DIY)।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস ব্যবস্থার আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপটি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।