নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশে শিল্পখাতে খেলাপি ঋণের (NPL) হার ৩১.২ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যাংকগুলো চরম আতঙ্কে ভুগছে বলে জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডাসিআই)। বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাজধানীর মতিঝিলে সংগঠনটির অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়।
‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বেসরকারি খাতকে পাশ কাটিয়ে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে ২৬.১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর বিপরীতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত বছর ছিল ৭.১৫ শতাংশ।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩,০৩৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৬৭৩ শতাংশ বেশি। এটি প্রমাণ করে যে ব্যাংকগুলো এখন ‘রিস্ক-ফ্রি’ বা ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা বেসরকারি খাতকে ঋণবঞ্চিত করে একটি চরম ‘ক্রেডিট ক্রাউডিং আউট’ (Credit Crowding Out) পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তারল্য থাকলেও ঋণ বিতরণে অনীহা
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমলেও ব্যাংক খাতে তারল্যের কোনো সংকট নেই বলে উল্লেখ করেন তাসকিন আহমেদ। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ৬.২৬ লাখ কোটি টাকার তারল্য সম্পদ এবং রেকর্ড ৩.২১ লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও (LCR) ১৮৫.৩১ শতাংশ, যা ন্যূনতম চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া আমানত প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৮.২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০.৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
শিল্প ও এসএমই খাতের ভয়াবহ চিত্র
প্রতিবেদনে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
- শিল্প ঋণ: মোট শিল্প ঋণের ৫০.৪৬ শতাংশ বর্তমানে অনাদায়ী।
- এসএমই খাত: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫.৪৩ শতাংশ বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ।
- খেলাপি ঋণ: শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩১.২ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যাংকগুলো এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতেও অনীহা দেখাচ্ছে।
সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং বাস্তবসম্মত কৌশলের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতের সহায়তায় গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা কাটাতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান, বিএবি (BAB) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা ঋণদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শিল্প ঋণের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন।