অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা
ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের বন্ধ এবং আংশিক সচল বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতকে পুরোপুরি পুনরুজ্জীবিত করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন (Pre-refinancing) তহবিল ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার জারি করে সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
‘বন্ধ বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত পুনর্গঠনে প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ শীর্ষক এই নীতিমালার আওতায় যোগ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট গ্রুপগুলো সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধন ঋণ নিতে পারবে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের বাজারভিত্তিক গড় সুদের হার যেখানে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ পাওয়ার সুযোগ দেশের উৎপাদন খাতের জন্য একটি বড় ধরনের স্বস্তি ও প্রণোদনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ঘোষিত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার রোডম্যাপেরই একটি অংশ এই তহবিল। বাজার সচল রাখতে গভর্নর যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি মাস্টার ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারই প্রথম ধাপ হিসেবে এই ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ছাড় করা হলো।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তহবিল থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে অর্থায়ন পাবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ মার্জিন যোগ করে ৭ শতাংশ সুদে তা বিতরণ করবে। বাংলাদেশে მოქმედ সব তফসিলি ব্যাংক এই তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে তা গ্রাহককে দিতে পারবে।
কারা পাবেন এই ঋণ?
তহবিলের অর্থ মূলত সেই সব বৃহৎ উৎপাদনমুখী শিল্প ও সেবা খাতের কারখানার জন্য বরাদ্দ করা হবে, যাদের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও স্রেফ চলতি মূলধনের (Working Capital) তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
এক্ষেত্রে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এমন কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা যে সব কারখানা এই তহবিল পেলে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফিরতে পারবে, তারা সবার আগে বিবেচনা পাবে। এ ছাড়া কোনো সচল ও দক্ষ কোম্পানি যদি বন্ধ বা অকার্যকর কোনো কারখানা লিজ (ইজারা) নিয়ে বা কিনে নিয়ে সচল করার উদ্যোগ নেয়, তারাও এই তহবিল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ পাবে।
তবে এই ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আবেদনকারীকে অবশ্যই ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ডেটাবেজ অনুযায়ী নিয়মিত গ্রাহক হতে হবে—কোনো খেলাপি ঋণ থাকা চলবে না। অর্থ পাচার (Money Laundering) কিংবা অতীতে ব্যাংকঋণ জালিয়াতি বা অপব্যবহারের রেকর্ড রয়েছে এমন কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা এই তহবিল থেকে কোনোভাবেই ঋণ পাবেন না।
ঋণ ব্যবহারের নিয়ম ও কড়াকড়ি
গ্রাহক পর্যায়ে এই চলতি মূলধন ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১ বছর। তবে কারখানার পারফরম্যান্স এবং সঠিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে তা নবায়ন করা যাবে। উদ্যোক্তারা এই ঋণের ক্ষেত্রে ৬ মাসের একটি গ্রেস পিরিয়ড (রেয়াতকাল) পাবেন। অর্থাৎ ঋণ নেওয়ার প্রথম ৬ মাস কোনো কিস্তি শোধ করতে হবে না, সপ্তম মাস থেকে কিস্তি আদায় শুরু হবে।
সার্কুলারে ঋণের অর্থ খরচের খাত সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত ঋণের টাকা দিয়ে কোনো কোম্পানি তাদের শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ ৪ মাসের বকেয়া মজুরি ও ভাতা পরিশোধ করতে পারবে। এ ছাড়া কারখানার বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ এবং উৎপাদন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কেনার কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের সমস্ত বেতন ও ভাতা সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাব অথবা জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সাথে যুক্ত যাচাইকৃত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নগদ (Cash) লেনদেন করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ঋণের টাকা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের আগের কোনো ব্যাংকঋণ বা দায় সমন্বয় (Adjust) বা পরিশোধ করা যাবে না।
কঠোর নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
তহবিলের অপব্যবহার বা অর্থ ভিন্ন খাতে ডাইভারশন রোধে একটি শক্তিশালী তদারকি কাঠামো গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট কারখানার বিক্রয় ও রাজস্বের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি তিন মাস পর পর ব্যাংকের প্রতিনিধিরা সশরীরে কারখানা পরিদর্শন করে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট তৈরি করবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সময় আকস্মিক ও সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন (ঝটিকা পরিদর্শন) করার অধিকার রাখবে।
ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে তাদের ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আয় ও ব্যয় স্রেফ একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই পরিচালনা করতে হবে।
যদি কোনো কোম্পানি সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে বকেয়া টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেবে এবং তার ওপর ২ শতাংশ শাস্তিমূলক সুদ (Penal Interest) আরোপ করা হবে।
উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যে সমস্ত কোম্পানি, উদ্যোক্তা এবং ব্যাংক এই স্কিমটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে, তাদেরকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।