নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের অগ্রগামী বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) বুধবার (১৫ এপ্রিল) তার গৌরবময় ৪৫ বছর পূর্ণ করে ৪৬তম বছরে পদার্পণ করেছে। গত সাড়ে চার দশকে দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সংস্থাটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালের ‘বেপজা আইন’-এর মাধ্যমে। স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
স্বল্প ভূমিতে বিশাল অর্থনীতি
বেপজা সীমিত ভূমি ব্যবহার করে উচ্চ অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জনের এক বৈশ্বিক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। দেশের মোট আয়তনের মাত্র ০.০০১ শতাংশেরও কম (৩,৫৫০ একর) জমি ব্যবহার করে জাতীয় রপ্তানিতে সংস্থাটি প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান ছিল ১৭.০৩ শতাংশ।
বিগত ৪৫ বছরে বেপজা প্রায় ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং ১২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে।
বিস্তৃতি ও আধুনিকায়ন
বর্তমানে বেপজা আটটি ইপিজেড পরিচালনা করছে: চট্টগ্রাম, ঢাকা, মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা, ঈশ্বরদী, আদমজী ও কর্ণফুলী। এছাড়া চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ পুরোদমে সচল রয়েছে এবং যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। উল্লেখ্য যে, এক সময়ের লোকসানি আদমজী জুট মিল ও চট্টগ্রাম স্টিল মিলকে ইপিজেডে রূপান্তর করে শিল্পখাতে সফলতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে বেপজা।
কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়ন
বেপজার অধীনস্থ জোনগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৫.৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন। এই বিশাল জনশক্তির বড় একটি অংশই নারী, যা দেশের সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শ্রমিকদের কল্যাণে ইপিজেডগুলোতে রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
পণ্যের বৈচিত্রায়ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন
তৈরি পোশাকের বাইরেও বেপজা রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য এনেছে। বর্তমানে ইপিজেডগুলোতে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক উপকরণ, ক্যামেরার লেন্স, চশমার ফ্রেম, বাইসাইকেল এবং উচ্চমানের জুতা তৈরি হচ্ছে।
সবুজ শিল্পায়নেও বেপজা বর্তমানে নেতৃত্বের আসনে। সংস্থাটিতে ২৭টি লিড (LEED) সার্টিফাইড গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে, যার মধ্যে ৮টি প্লাটিনাম রেটেড। এছাড়া ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইপিজেডগুলোতে ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আস্থার প্রতীক বেপজা
বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দিতে বেপজার ‘ওয়ান উইন্ডো সার্ভিস’ মডেল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এক আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে বেপজা আজ বিশ্বজুড়ে শিল্পায়নের এক সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। ৪৬তম বছরে পদার্পণ করে সংস্থাটি এখন টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।