নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ঢাকা : দেশের আর্থিক খাতকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অফার-ভিত্তিক নির্দেশকের পরিবর্তে প্রকৃত লেনদেনের ভিত্তিতে ‘মানি মার্কেট রেফারেন্স রেট’ যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাপরিচালক ইস্তেকুমাল হোসেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী এতে বক্তব্য রাখেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ওয়েবসাইটে এই নতুন রেট বা হার প্রকাশ শুরু করবে। বৈশ্বিক মানদণ্ড ‘সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’ (SOFR) মডেলের আদলে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য অর্থবাজারে স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
ডিবর (DIBOR) থেকে রিয়েল-টাইম তথ্যে উত্তরণ: ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (BAFEDA) ঢাকা ইন্টারব্যাংক অফার রেট (DIBOR) প্রকাশ করে আসছে। তবে ডিবর মূলত ব্যাংকগুলোর দেওয়া ‘অফার রেট’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতো, প্রকৃত লেনদেনের ওপর নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এটি বাজারের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারতো না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নিজস্ব অটোমেটেড সিস্টেম ব্যবহার করে প্রকৃত আন্তঃব্যাংক লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে হার গণনা করবে।
নতুন দুটি বেঞ্চমার্ক রেট: কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানত দুটি বেঞ্চমার্ক রেট চালু করবে: ১. বাংলাদেশ ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (BOFR): এটি একটি ঝুঁকিহীন হার, যা মূলত আন্তঃব্যাংক রেপো (সিকিউরড) লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। ২. ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট (DOMMR): এটি আন-সিকিউরড মানি মার্কেট রেফারেন্স রেট, যা ইন্টারব্যাংক মানি মার্কেট প্ল্যাটফর্মের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।
পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা: প্রতি কার্যদিবসের সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই হারগুলো প্রকাশ করা হবে। সুদের হার এবং লেনদেনের পরিমাণের ‘ভলিউম-ওয়েটেড মিন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে এটি গণনা করা হবে। তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে যাতে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন (outlier) বাজারদরের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে।
BOFR-এর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ওভারনাইট এবং ১ সপ্তাহের হার প্রকাশ করা হবে। অন্যদিকে, DOMMR-এর ক্ষেত্রে ওভারনাইট, ১ সপ্তাহ, ১ মাস এবং ৩ মাস মেয়াদি হার জানানো হবে। কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদে পর্যাপ্ত লেনদেন না হলে ‘রোলিং উইন্ডো’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
আর্থিক খাতে প্রভাব: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এই নতুন কাঠামো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দিনের শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। এটি উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন এবং নতুন নতুন মানি মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্ট উদ্ভাবনে সহায়তা করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, “এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে একীভূত করবে এবং আর্থিক বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে।” স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।