অর্থনীতি ডেস্ক (বিডি ইকোনমি): ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দ বৈষম্য এবং কাঠামোগত ত্রুটিগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক建模 (সানেম)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দেশ দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত ১১ জুন ২০২৬ সংসদে পেশ করা বাজেট বিশ্লেষণ করে সানেম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জ্বালানি নিরাপত্তাকে ১০টি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অন্যতম ঘোষণা করা হলেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পেয়েছে মাত্র ১৭,৩৪৫ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের মাত্র ১.৮৫ শতাংশ, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২.১৫ শতাংশ।
দেশের জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আর্থিক দায় মেটাতে সরকার পিডিবি-কে (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) সর্বোচ্চ ৩৬,০০০ কোটি টাকা এবং গ্যাস ও অন্যান্য খাতে ৩১,০১৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। মন্ত্রণালয়ের ভেতরে বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে ১৪,৯৯৬ কোটি টাকা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি) পেয়েছে মাত্র ২,৩৪৯ কোটি টাকা। ইএমআরডির বরাদ্দ গত বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৭১.৯৬ শতাংশ বাড়লেও দুই বিভাগের মধ্যে এখনো ৮৪.৩৪ শতাংশের বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
তবে সানেম বাজেটের কিছু মাইলফলক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০–৫০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকারের রয়েছে, তা অর্জনে এবারই প্রথম সৌর বিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর, গ্রাহকদের সৌর বিদ্যুতের বিলে ৫% রেয়াত এবং ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত সৌর উপকরণের ওপর সম্পূর্ণ শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) আমদানিতে শুল্ক ৯৩% থেকে কমিয়ে ৬৪% (২৫ হাজার ডলারের নিচের গাড়ির জন্য) করা হয়েছে এবং সনাতন জ্বালানি চালিত গাড়ির (১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি) ট্যাক্স ১৩২% থেকে বাড়িয়ে ১৫৬% করা হয়েছে।
মূল কাঠামোগত উদ্বেগসমূহ
এই ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি সানেম বেশ কিছু গুরুতর কাঠামোগত ত্রুটি ও জীবাশ্ম জ্বালানি প্রীতির কথা উল্লেখ করেছে:
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থায় অবহেলা: বিদ্যুৎ বিভাগের মোট উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ০.১ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে স্রেডা (SREDA), এবং মোট বিদ্যুৎ ব্যয়ের মাত্র ২.৫৩ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো।
- সুবিধা সীমিতকরণ: এনবিআর-এর সাম্প্রতিক আদেশে সৌর বিদ্যুতের সুবিধাগুলো কেবল ভ্যাট-কমপ্লায়েন্ট সেলফ-কনজাম্পশন উৎপাদক এবং রেসকো (RESCO) মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ আমদানিকারক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
- নীতিমালার অনুপস্থিতি: বায়ু বিদ্যুৎ, সৌর সেচ (১৭ লাখ ডিজেল পাম্প প্রতিস্থাপন) এবং সৌর সড়ক বাতির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক বা নীতিগত সহায়তা রাখা হয়নি।
- প্রণোদনা দ্রুত প্রত্যাহার: ২০২৮ সালের জুনের পর দেশীয় লিথিয়াম সেল ও ব্যাটারি উৎপাদন খাতের প্রণোদনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে।
- জীবাশ্ম জ্বালানির লক-ইন: বাজেটে একই সঙ্গে ৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্য, বড়পুকুরিয়া ও দিঘিপাড়ায় ৭৪টি নতুন প্রকল্প, কয়লা আমদানিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুল্ক সুবিধা এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের মাধ্যমে ৩০ লাখ মেট্রিক টন তেল শোধন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা গ্রিন ট্রানজিশনের পরিপন্থী।
সানেমের মূল সুপারিশসমূহ
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই রূপান্তর নিশ্চিত করতে সানেম নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো করেছে: ১. জ্বালানি খাতের ঐতিহাসিক আন্ডার-ফান্ডিং দূর করতে দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া। ২. বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আরও গ্রিন প্রজেক্ট অনুমোদন করা যাতে বাজেটের সাথে প্রতিশ্রুতির মিল থাকে। ৩. জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকির একটি অংশ নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তর এবং স্রেডাকে (SREDA) একটি কার্যকর ‘সিঙ্গেল-উইন্ডো হাব’-এ রূপান্তর করা। ৪. সৌর বিদ্যুতের কর ও শুল্ক সুবিধা কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে পুরো ভ্যালু চেইনের জন্য উন্মুক্ত করা। ৫. ব্যাটারি উৎপাদন খাতের শুল্ক ছাড় ২০২৮ সালের পর আরও অন্তত ১০ বছর বাড়ানো যাতে দেশীয় শিল্প বিকশিত হতে পারে। ৬. দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের স্বার্থে বায়ু বিদ্যুতের জন্য ডেডিকেটেড নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।