বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
সর্বশেষ:
রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন: এপ্রিলের ২৯ দিনেই এলো ৩০০ কোটি ডলার ইসলামী ব্যাংক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি; বিতর্কিত সিদ্ধান্তে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকারদের উদ্বেগ<gwmw style="display:none;"></gwmw><gwmw style="display:none;"></gwmw> প্রথম প্রান্তিকে সিটি ব্যাংকের মুনাফায় ১৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি; ঋণ প্রবাহ নিয়ে এমডির উদ্বেগ সার্ক শক্তিশালী হলে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি আরও সমৃদ্ধ হবে: নজরুল ইসলাম খান<gwmw style="display:none;"></gwmw> বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নীতি সংস্কারের তাগিদ ব্যবসায়ী নেতাদের<gwmw style="display:none;"></gwmw><gwmw style="display:none;"></gwmw> ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিতে কঠোর বিএফআইইউ: শীর্ষ কর্মকর্তাদের নৈতিক অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক অভিজ্ঞ ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য ডিপ্লোমা বাধ্যতামূলক নয়: নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেড় মাসে হামের উপসর্গে ২২৭ শিশুর মৃত্যু: ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৮৮ আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২২.৭৫ টাকায় স্থিতিশীল

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শঙ্কার মেঘ: আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এই সংকটের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি হাজার হাজার টন রপ্তানি পণ্য আটকা পড়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ হুমকির মুখে পড়ায় জ্বালানি সংকট, রেকর্ড জাহাজ ভাড়া এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বহুমুখী সংকটের মুখে পড়তে পারে দেশ।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতিতে সব উদ্যোক্তাই রপ্তানি ও আমদানি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা রপ্তানি চালানের বিষয়ে সরকার এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”

একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “রপ্তানি মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা সচল রাখতে টেকসই পরিবেশ প্রয়োজন। আমদানি-রপ্তানি বা জ্বালানি সরবরাহে যেকোনো বিঘ্ন ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।”

অস্থির জ্বালানি বাজার গত বুধবার (৪ মার্চ) বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০২৫ সালের শুরুর দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৮২.৫৩ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৭৫.৩৭ ডলারে উঠেছে।

বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ মেটায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি (LNG) সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সরাসরি আঘাত আসবে।

রপ্তানি পণ্যের জট ও পণ্য পরিবহনে স্থবিরতা চলমান সংঘাতের কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরে লজিস্টিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে:

আকাশপথ: কাতার, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকা থেকে কার্গো অপারেশন স্থগিত করেছে। ফলে বিমানবন্দরে প্রায় ১,২০০ টন তৈরি পোশাক (RMG) আটকা পড়েছে।

নৌপথ: ভূমধ্যসাগরীয় শিপিং কোম্পানি (MSC)-সহ বিভিন্ন শিপিং লাইন মধ্যপ্রাচ্যগামী কন্টেইনার বুকিং বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যবাহী ১,০০০-এর বেশি কন্টেইনার বিভিন্ন বন্দরে আটকা পড়ে আছে।

উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতি যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে দেশের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল পরিবহনে প্রতি টনে খরচ ৮-১০ ডলার বেড়েছে।

সিপিডি (CPD)-র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যুদ্ধের স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হলেও প্রভাব তাৎক্ষণিক। বর্তমানে লজিস্টিক সমস্যা দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। আমাদের বিকল্প উৎস খোঁজার জন্য জরুরি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।”

কৌশলগত ঝুঁকি এই সংঘাত বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি করেছে: ১. পথ পরিবর্তন: জাহাজগুলো ‘কেপ অব গুড হোপ’ রুট ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে, যা যাত্রাপথে অতিরিক্ত ৫,০০০ কিলোমিটার যোগ করছে। এতে ফ্রেইট চার্জ ও সময়—উভয়ই বাড়ছে। ২. কাঁচামাল সংকট: তুলা ও পেট্রোকেমিক্যাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে টেক্সাস ও প্লাস্টিক শিল্প সংকটে পড়ছে। ৩. রেমিট্যান্স ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সানেম (SANEM)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানসহ অন্যান্য অর্থনীতিবিদরা সরকারকে গবেষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জরুরি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও সরকার জানিয়েছে দেশে কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি ও খাদ্যশস্য মজুত আছে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন ‘কৌশলগত মজুত’ এবং ‘উৎসের বৈচিত্র্যকরণ’ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হলে বাংলাদেশকে কঠিন মিতব্যয়িতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।