সোমবার ৮ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ:
১১ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩.৪১%: ইইউ-ইউএসএতে মন্দা হলেও কানাডায় প্রবৃদ্ধি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ দাবি ব্যাংক খাতের সংস্কারে স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে: তথ্যমন্ত্রী বন্ধ কারখানা সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, সুদ মাত্র ৭ শতাংশ অর্থবছরে রেমিট্যান্সে ১৮ শতাংশের বড় প্রবৃদ্ধি, জুনের শুরুতে সামান্য হ্রাস আইএমএফের কাছে নতুন করে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ মে মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭.০৯ শতাংশ, ১১ মাসের সম্মিলিত আয় নেমেছে ৪৩.৭৯ বিলিয়ন ডলারে<gwmw style="display:none;"></gwmw> নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের বিক্ষোভ ৩য় দিনে, প্রধান কার্যালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিতে প্রতি তিন টাকার এক টাকা<gwmw style="display:none;"></gwmw>

নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের বিক্ষোভ ৩য় দিনে, প্রধান কার্যালয় ঘেরাওয়ের হুমকি

ঢাকা, ৩ জুন (বিডিইকোনমি ডটনেট) — ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বুধবার টানা তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নতুন চেয়ারম্যান ব্যাংকে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রধান কার্যালয় অবরুদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ ব্লকেড করা হবে।

বুধবার রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি মতিঝিল প্রদক্ষিণ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এসে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

সমাবেশে ফোরামের আহ্বায়ক নূরুন্নবী মানিক সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে তারা কোনোভাবেই সশরীরে এই পদে বসতে দেবেন না। নতুন চেয়ারম্যান ব্যাংকে প্রবেশের চেষ্টা করলে ‘ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার’ অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘেরাও করা হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।

এর আগে গত দুই দিন ধরে মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করে। গত সোমবার বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে, এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। তবে আজ বুধবারও পুরো এলাকা জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে; জলকামান ও সাঁজোয়া যান (এপিসি) প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, একটি “লুটেরা গোষ্ঠী”র হাতে শরিয়াহ-ভিত্তিক এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় তুলে দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারের একটি মহলের মধ্যে “ষড়যন্ত্র” চলছে। তারা আরও দাবি করেন, ব্যাংক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

চলমান এই আন্দোলনের কারণে গত সোমবার ব্যাংকের পূর্বনির্ধারিত পর্ষদ সভা সশরীরে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। তবে ওই দিন রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতিতে খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪০ মিনিটের ওই ভার্চুয়াল সভায় এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয় এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না। তিনি বলেন, “রাস্তার আন্দোলনের মুখে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক তার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।” ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক বা কোনো গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, খুরশীদ আলমের নামে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে কোনো ব্যক্তিগত খেলাপি ঋণ নেই। তবে তার স্ত্রীর নামে থাকা একটি ঋণ বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

মালিকানা সংকট ও তারল্য সংকটের ইতিহাস:

আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান এই সংকট কেবল চেয়ারম্যান বা এমডি পদের রদবদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের এক অদৃশ্য লড়াই।

ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংঘাতপূর্ণ বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্টদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক নিজেদের হাতে নেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, এস আলম গ্রুপ সরাসরি এবং বেনামি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৮৫,৪৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এস আলম সমর্থিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এর পর ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও আমানত বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু গত ২৪ মে চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমানের আকস্মিক বিদায় এবং খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকে আবারও তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যার কারণে অনেক শাখা ও এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ ঘোষণা দিয়েছে, যতক্ষণ না কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সুশাসন কাঠামো নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশব্যাপী এই আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।