ঢাকা, ২৩ জুন (বিডিকনমি ডটনেট) — বাংলাদেশ সরকারের নতুন ঋণ প্রস্তাবের বিপরীতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কারের শর্ত দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিশেষ করে, ব্যাংক কোম্পানি আইনে সম্প্রতিকালে যুক্ত হওয়া বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের পাশাপাশি একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা দাবি করেছে বৈশ্বিক এই ঋণদাতা সংস্থা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
গত ১ জুন সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে সম্পূর্ণ নতুন একটি ঋণ প্যাকেজের আনুষ্ঠানিক আবেদন করার পর এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মঙ্গলবার (২৩ জুন) জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। এই বিতর্কিত ধারাটির মাধ্যমে মূলত জোরপূর্বক একীভূত (Forced-merged) বা পুনর্গঠন করা ব্যাংকের মালিকানা আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি আইনি সুযোগ রাখা হয়েছিল। বহুপাক্ষিক এই সংস্থাটি মনে করে, এই ধারাটি সুশাসনের অন্তরায় এবং এটি আর্থিক খাতে জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দেবে।
আইএমএফের শর্ত পূরণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার নীতিগতভাবে এই ১৮(ক) ধারাটি আইন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য শর্তাবলী
বিতর্কিত ধারা বাতিলের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ:
- খেলাপি ঋণ (NPLs) দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা।
- দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফলভাবে একীভূত করা।
- বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করা।
রাজস্ব খাতে কঠোর চাপ
ব্যাংকিং খাতের বাইরে রাজস্ব নীতিতেও কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি ঢালাওভাবে ১৫ শতাংশ ইউনিফর্ম বা একক ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) হার চালু করা এবং টার্নওভার ট্যাক্সের পরিধি বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার একক ভ্যাট হার চালুর বিষয়ে একমত হলেও এর সর্বোচ্চ সীমা ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে রাখতে দরকষাকষি করার পরিকল্পনা করছে। তাছাড়া লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বিবেচনায় সরকার এখনই টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ করতে আগ্রহী নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অ্যাকাউন্টিং অবকাঠামো আধুনিকায়নের পর এটি বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও ঋণের আকার
পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনৈতিক প্রস্তুতি মূল্যায়ন করতে আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। এই মিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভায় চূড়ান্ত আলোচনা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন এই ঋণ চুক্তি সই হতে পারে।
আইএমএফের কোটা নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ ৪.৬৪ বিলিয়ন এসডিআর (SDR) পর্যন্ত ঋণ নিতে সক্ষম, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।