ঢাকা, বিডিইকোনমি ডটনেট : প্রস্তাবিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এর অত্যন্ত বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সম্পাদক পরিষদ (সাম্পাদক পরিষদ)। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এই ধারার মাধ্যমে ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সাবেক বিতর্কিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের আবারও দুর্বল ব্যাংকগুলোর মালিকানায় ফিরে আসার পথ সুগম হতে পারে।
সোমবার (৮ জুন) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের সাথে সম্পাদক পরিষদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংক খাতে সুশাসন রক্ষা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে এই উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে।
তিনি বলেন, “আমাদের আলোচনায় মূলত ব্যাংকিং খাতে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ (এনপিএল), কাঠামোগত ব্যাংক সংস্কারের ধীরগতি, আমানতকারীদের অর্থের শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চলমান অস্থিরতার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারার ক্ষতিকর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কেও আমরা বিস্তারিত মতবিনিময় করেছি।”
উলেখ্য, ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারাটি সম্প্রতি আর্থিক বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই বিধির আওতায়, একীভূতকরণ (মার্জার) বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় রেজুলেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো দুর্বল বা সংকটাপন্ন ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে আবারও মালিকানায় বা পর্ষদে ফিরে আসার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি কার্যত ব্যাংক খাতের অর্থ লুটেরাদের জন্য একটি ‘ব্যাকডোর এন্ট্রি’ বা পেছনের দরজা দিয়ে মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি করবে।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোরভাবে স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তারা দাবি করেন, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে বা জোরপূর্বক একীভূতকরণের শিকার হলে তার দায় যেন কোনোভাবেই সাধারণ আমানতকারীদের ওপর না বর্তায়, সে জন্য একটি নিশ্ছিদ্র ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে।

জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোশতাকুর রহমান প্রতিনিধিদলকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক খাতের পদ্ধতিগত দুর্বলতা বা সমস্যাগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত রয়েছে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও আর্থিক খাতে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
ব্যাংকিং খাতের বাইরেও এই বৈঠকে দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক, যেমন—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ধীরগতি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সাধারণত প্রতি বছর নতুন অর্থবছরের বাজেট এবং নতুন মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি) ঘোষণার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ধরনের পরামর্শমূলক সভার আয়োজন করে থাকে।

বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের একটি দল অংশ নেন। তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মতিউর রহমান (প্রথম আলো), মতিউর রহমান চৌধুরী (মানবজমিন), দেওয়ান হানিফ মাহমুদ (বণিক বার্তা), শামসুল হক জাহিদ (দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস), শাহেদ মোহাম্মদ আলী (দৈনিক সমকাল), এএমএম বাহাউদ্দিন (দৈনিক ইনকিলাব), মো. রেজাউল করিম লোটাস (ডেইলি সান), আলতামাশ কবির (সংবাদ), মোস্তফা মামুন (আগামীর সময়) এবং মো. মোজাম্মেল হক (করতোয়া)।