নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডি ইকোনমি ঢাকা: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।
সংগঠনের নেতারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭ শতাংশ, যা জনগণের চিকিৎসা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য বাড়ছে এবং নাগরিকদের চিকিৎসার সিংহভাগ ব্যয় নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত “জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এনডিএফের পক্ষ থেকে এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ ব্যয় করার কথা থাকলেও বাংলাদেশ খরচ করছে মাত্র ০.৭ শতাংশ। উপরন্তু, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই নাগরিকদের নিজেদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ড. মিজানুর রহমান আরও বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন এবং মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাতকে খরচ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কম বরাদ্দ ও বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি শূন্য খরচে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
বৈঠকে অন্য বক্তারা বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বর্তমানে ‘স্বল্প সম্পদ, উচ্চ চাহিদা’ সংকটে জর্জরিত। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, জেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব, রাজধানী-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে এনডিএফ জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের পাশাপাশি মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ ১০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত করার দাবি জানায়। এছাড়া জেলা পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ), ডায়ালাইসিস, ক্যানসার ও হৃদরোগের চিকিৎসাকেন্দ্র সম্প্রসারণের মাধ্যমে জেলাগুলোকে ‘মেডিকেল হাব’-এ রূপান্তরের সুপারিশ করে সংগঠনটি।
এনডিএফের অন্যান্য প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে—জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু করা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ।
অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নিও বক্তব্য রাখেন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এ সবুর, অধ্যাপক ড. শাদরুল আলম, অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলী মিয়া এবং অধ্যাপক ড. মহসিন আহমেদ প্রমুখ। বক্তারা উল্লেখ করেন, কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা এবং শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার মতো একটি টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।