ঢাকা, ১৫ জুলাই (বিডিইকোনমি) — ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদালতের আদেশে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সম্পদ ক্রোক (সেজ) করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ক্রোক হওয়া এই সম্পদের মধ্যে ৫৭ হাজার কোটি টাকা দেশের অভ্যন্তরে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বিদেশে রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সম্পদগুলো ক্রোক অবস্থাতেই থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ প্রধান ড. ইখতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন পিএইচডি, এফসিএমএ এই তথ্য জানান। বিএফআইইউর সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, দেশের মানুষের সম্পদ সুরক্ষায় কাজ করতে বিএফআইইউ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয় বিবেচনা না করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যেকোনো সন্দেহজনক লেনদেনের তদন্ত করছে এই সংস্থা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও জানান, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে, যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সন্দেহজনক আর্থিক রিপোর্টে ৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় রেকর্ড ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সংস্থাটি মোট ৩০,১৯৯টি সন্দেহজনক রিপোর্ট পেয়েছে, যার মধ্যে ২০,৫২৪টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (STR) এবং ৯,৬৭৫টি সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (SAR)। এটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১৭,৩৪৫টি রিপোর্টের তুলনায় একটি বড় ধরনের বৃদ্ধি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫,২৮০টি রিপোর্টের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।
বিএফআইইউ এই নাটকীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি অন্যতম কারণ চিহ্নিত করেছে:
- রিপোর্টিং সংস্থাগুলোর ওপর বিএফআইইউর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা আরোপ।
- লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং প্যাটার্ন সনাক্তকরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি।
- অর্থ পাচার ও অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
- অনলাইন জুয়া ও বাজি, ফরেক্স ও ক্রিপ্টো ট্রেডিং এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো সন্দেহজনক কার্যক্রমের ব্যাপক বৃদ্ধি।
রিপোর্ট দাখিলে ব্যাংকিং খাতের আধিপত্য
পেশ করা রিপোর্টের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ব্যবস্থার সিংহভাগই ব্যাংকিং খাতের দখলে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রিপোর্টের ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে, যা আগের বছর ছিল ৯২ শতাংশ। ব্যাংকগুলো এ বছর মোট ২৮,৭৫৫টি রিপোর্ট জমা দিয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১৫,৯৯১টির তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এফআই) এবং মানি রেমিটারদের অবদান ছিল যথাক্রমে মাত্র ১ শতাংশ ও ৪ শতাংশের মতো সামান্য।
তদন্তকারী সংস্থার তথ্য চাহিদা ও ক্যাশ লেনদেন হ্রাস
বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (এলইএ) এবং গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বিএফআইইউর কাজের সমন্বয়ও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য চেয়ে সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক আবেদনের সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের ১,১৫৭টি থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে ১,৩২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলনের বাধ্যবাধকতামূলক ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট (সিটিআর) দাখিলের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাক্রমে ১৯,৪৫২ বিলিয়ন টাকা মূল্যের ৩১.২৫ মিলিয়ন নগদ লেনদেন এবং ২.১৭ বিলিয়ন টাকা মূল্যের ১,৪৮৪টি লেনদেনের তথ্য রিপোর্ট করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশবিহীন বা ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার প্রসারের কারণেই মূলত নগদ লেনদেনের এই রিপোর্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।