ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর (বিডিইকোনমি) — দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরের অবমূল্যায়নের ধারা পেরিয়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশি টাকা। রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ০.০৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া গত ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর—এই তিন সপ্তাহের ব্যবধানে টাকার মান শক্তিশালী হয়েছে ০.৭৭ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এ সময় প্রতি ডলারের দাম ৮৫.৮০ টাকা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩.৯৫ টাকায় গিয়ে পৌঁছায়। অর্থাৎ, এ সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে ৩৮.২০ টাকা বা ৪৫.০৫ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। গত ৩০ আগস্ট ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৩.৯৫ টাকায় ওঠার পর ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা ৯৫ পয়সা কমে ১২৩.০০ টাকায় নেমে আসে। ফলে মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে ০.৭৭ শতাংশ।
টাকার মূল্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস
- ২০১৯ (ডিসেম্বর): প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৪.৯০ টাকা।
- ২০২০ (ডিসেম্বর): মহামারিজনিত কারণে আমদানি হ্রাস, বিশ্ববাজারে পণ্যের নিম্নমূল্য ও প্রবাহমান রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে ডলারের দাম ১০ পয়সা কমে ৮৪.৮০ টাকায় নেমে আসে (টাকার মান বাড়ে ০.১২%)।
- ২০২১ (ডিসেম্বর): বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ আমদানি চাপ বাড়ায় ডলারের দর বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮৫.৮০ টাকা (টাকার মান কমে ১.১৮%)।
- ২০২২ (ডিসেম্বর): রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও কাঁচামালের দরবৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় লাফিয়ে বাড়ে, অন্যদিকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স শ্লথ হয়ে পড়ে। ডলারের দাম ২০.০৫ টাকা বা ২৩.৩৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫.৮৫ টাকায়।
- ২০২৩ (ডিসেম্বর): অব্যাহত চাপে ডলারের দর আরও ৪.১৫ টাকা বা ৩.৯২ শতাংশ বেড়ে ১১০.০০ টাকায় পৌঁছায়।
- ২০২৪ (ডিসেম্বর): এক বছরে ডলারের দাম আরও ১০.০০ টাকা বেড়ে ১২০.০০ টাকায় উঠে যায়, ফলে টাকার মান কমে ৯.০৯ শতাংশ।
- ২০২৫ (ডিসেম্বর): অবমূল্যায়নের ধারা অব্যাহত রেখে ডলার দাঁড়ায় ১২২.৩৩ টাকায়, যা এক বছরে ২.৩৩ টাকা বা ১.৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
আঞ্চলিক মুদ্রার সঙ্গে তুলনা
গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুনের তথ্য বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে আঞ্চলিক মুদ্রাগুলোর চিত্র তুলে ধরা হয়:
- মান কমেছে যেসব মুদ্রার: ভারতীয় রুপি প্রায় ৯.৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কান রুপি ১০ শতাংশের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়ান রূপিয়া প্রায় ৯ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে।
- মান বেড়েছে যেসব মুদ্রার: মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত ও চীনা ইউয়ানের মান বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ করে এবং পাকিস্তানি রুপি শক্তিশালী হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রভাব
টাকার অবমূল্যায়ন সরাসরি দেশে আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়—বিশেষ করে জ্বালানি, শিল্প কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া বৈশ্বিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে দেশীয় মুদ্রার অতিরিক্ত ভার তৈরি করে।
অন্যদিকে, টাকার এই শক্তিশালী অবস্থান আমদানি ব্যয়ের চাপ কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সার্বিক অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।