অর্থনীতি ডেস্ক (বিডি ইকোনমি): দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর পল্টনে ইআরএফ অডিটোরিয়ামে যৌথভাবে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির যৌথ আয়োজক ছিল এসএমই ফাউন্ডেশন ও অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী জানান, নতুন ব্যবসার শুরু থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স ও সনদ প্রাপ্তির সময়সীমা ৩৫৫ দিন থেকে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার। এছাড়া উৎপাদন খাতের বাধা দূর করতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি (বিদ্যুৎ ও গ্যাস) সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রী ঘোষণা করেন, সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার উদ্দীপনা প্যাকেজ (স্টিমুলাস প্যাকেজ) থেকে বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরেও দেশের সিলেট, পাবনা এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ২০০ একর করে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে ডেডিকেটেড এসএমই হাব, প্রোডাক্ট মডেলিং ল্যাব এবং উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
দেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এক দশক আগে বাংলাদেশের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত বেশ কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনুৎপাদনশীল খাতে দেদারসে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার কারণে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ হয়নি এবং কর-জিডিপি অনুপাতও বাড়েনি। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের জন্য আরও ৩ বছরের ট্রানজিশন বা গ্রেস পিরিয়ড (অতিরিক্ত সময়) চাওয়া হয়েছে।
লজিস্টিক খাতের অদক্ষতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে বিশ্বব্যাপী লজিস্টিক খরচ পণ্যের মূল্যের গড়ে ১০ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই খরচ কমিয়ে আনতে সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে। একই সাথে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জানান, ২০ Font২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পেশ করা ১১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩৬টি প্রস্তাব সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে আয়কর সংক্রান্ত ১২টি, ভ্যাট সংক্রান্ত ৫টি এবং শুল্ক সংক্রান্ত ১৯টি প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নতুন বাজেটে সিএমএসএমই খাতের জন্য প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে মূল প্রবন্ধে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়, জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ এবং খসড়া জাতীয় এসএমই নীতিমালা ২০২৬-এ যে সব নীতিগত সুবিধার কথা বলা হয়েছে, এনবিআর তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করছে না। এই জটিলতা দূর করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সমন্বিত ‘প্রেফারেন্সিয়াল ট্যাক্স রেজিম ফর এমএসএমই’ বা পৃথক এসআরও (SRO) জারির দাবি জানায় ফাউন্ডেশন।
ফাউন্ডেশন সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য চলমান ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বাড়িয়ে শুধু এসএমই ফাউন্ডেশনের জন্যই ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করেছে। এছাড়া ‘একটি গ্রাম-একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য প্রস্তাবিত ৩০০ কোটি টাকা থেকে অন্তত ১০০ কোটি টাকা এবং ক্লাস্টারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি এসএমই উন্নয়নের জন্য বার্ষিক ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনবিআর সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, সরকার একটি শিল্প-বান্ধব বাজেট দিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে প্রগতিশীল ন্যূনতম কর ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ আলম।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের অন্তর্গত, যা দেশের মোট শিল্প কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ বা ৩ কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস।