অর্থনীতি ডেস্ক (বিডি ইকোনমি): বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ৪৫ কোটি (৪৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকদের বোর্ড ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (Financial Sector Support Project II)-এর আওতায় এই অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাংকের এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে জোরদার করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও পদ্ধতিগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। পাশাপাশি এটি ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধান (bank resolution) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারের পথ সুগম করবে। এটি আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি, জরুরি তারল্য সহায়তা (Emergency Liquidity Assistance) কাঠামো প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক পুনর্গঠন কৌশল উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স (প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন), রেগুলেটরি ক্যাপচার (নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার) এবং রিলেটেড-পার্টি লেন্ডিং (সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান)-এর কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) অনুপাত আকাশচুম্বী হয়ে ৩২.৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণ ৭.৯ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত (Capital-to-risk-weighted assets ratio) নেমে এসেছে ঋণাত্মক (-২.৬) শতাংশে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জিন পেসমে (Jean Pesme) বলেন, “এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার যে লক্ষ্য বাংলাদেশের রয়েছে, তার জন্য একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত অপরিহার্য। কিন্তু দেশের ব্যাংকিং খাত—যা মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ধারণ করে—তা বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই প্রকল্প ক্ষুদ্র আমানতকারীদের রক্ষা করতে, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
এছাড়া, ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলা এবং খাতভিত্তিক ডেটা ও অ্যানালিটিক্সের ঘাটতি দূর করতে এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোকে আধুনিকায়ন করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং ডেটা-চালিত ও ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি (risk-based supervision) সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট এবং এই প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তোশিয়াকি ওনো (Toshiaki Ono) জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে একটি সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবেলা এবং আর্থিক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।