অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ঢাকা: আগামী ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৬ সালের মধ্যে সমস্ত ব্যক্তিগত আমানতকারীদের মূল টাকাসহ অর্জিত সম্পূর্ণ মুনাফা ফেরত দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতাযুক্ত প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছে ‘দ্য অ্যালায়েন্স ফর সিক্স এনবিএফআই ডিপোজিটরস রিকভারি কমিটি’ ।
শনিবার (২৩ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংকটে থাকা দেশের ৬টি অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ১২ হাজার ব্যক্তিগত আমানতকারীর এই প্ল্যাটফর্মটি সরকারের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো ধরনের শর্তসাপেক্ষ বা অনানুষ্ঠানিক আশ্বাস সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ।
আক্রান্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—এফএএস (FAS) ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস । এই ৬টি প্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার সাধারণ আমানতকারীর প্রায় ৩,৫২৫ কোটি টাকা আটকে রয়েছে । এর মধ্যে পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদের টাকা ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে ।
সংগঠনটি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, গত ৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ নীরব প্রতিবাদ এবং আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত অ্যালায়েন্সের সাথে কোনো সরাসরি যোগাযোগ করা হয়নি ।
কমিটির আহ্বায়ক জাফর উল্লাহ খান বলেন, “আমরা শুধু সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কিছু কথা শুনছি। এখনো কোনো অধ্যাদেশ জারি হয়নি, আমাদের কাছে কোনো সরকারি আদেশও পৌঁছেনি । আমাদের অনেক সদস্য ২০১৯ সালের জুলাই থেকে অপেক্ষা করছেন । আমরা কোনো ‘প্রক্রিয়াধীন’ ভাষাকে আইনগত প্রতিশ্রুতির বিকল্প হিসেবে মেনে নেব না । প্রজ্ঞাপন জারি করুন, সময়সীমা নির্ধারণ করুন এবং লিখিতভাবে দিন ।”

আমানতকারীদের প্রধান ৩ দাবি:
- লিখিত প্রজ্ঞাপন ও নির্দিষ্ট সময়সীমা (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬): আমানতকারীরা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক প্রজ্ঞাপন দাবি করেছেন । সংবাদমাধ্যমে ‘জুলাই থেকে অর্থ ছাড় হতে পারে’ বা ‘লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে’—এমন শর্তসাপেক্ষ খবর কোনো স্থায়ী সমাধান বা আইনি আদেশের বিকল্প হতে পারে না বলে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ।
- পূর্ণ অর্জিত মুনাফা পরিশোধ: গণমাধ্যমের বরাতে শুধু মূল টাকা ফেরত দেওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে অ্যালায়েন্স । বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং চুক্তিভিত্তিক আমানত হারের হিসাব তুলে ধরে তারা জানান, ২০১৯ সালে যিনি ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন, মুনাফা বঞ্চনা ও মূল্যস্ফীতির কারণে আজ তার সম্মিলিত ক্ষতি প্রায় ১২.৩৮ লাখ থেকে ১৩.৭৮ লাখ টাকা । ২০১৯ সালের ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে আজ প্রয়োজন প্রায় ১৬.৭৮ লাখ টাকা । তাই চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ অর্জিত মুনাফা ছাড়া কোনো আংশিক সমাধান মেনে নেওয়া হবে না ।
- লুটপাটকারীদের সম্পূর্ণ জবাবদিহি: সরকার যদি অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নেয়, তবুও ভুয়া কোম্পানি ও জাল ঋণের মাধ্যমে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলো লুট করেছে, সেই পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঋণখেলাপিদের ব্যক্তিগত দায় একবিন্দু কমবে না । দায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা নিশ্চিত করা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং অপরাধীদের নাম প্রকাশ করে একটি ‘পাবলিক রেজিস্টার’ চালুর দাবি জানিয়েছে কমিটি ।
অ্যালায়েন্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক কাউসার হোসাইন চৌধুরী বলেন, আমানতকারীরা কোনো জুয়া খেলেননি বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করেননি; তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ও বৈধতার সিলের ওপর বিশ্বাস রেখে জীবনভর সঞ্চিত অর্থ জমা রেখেছিলেন । ফলে এই ধস কোনো ব্যক্তিগত ভাগ্যদোষ নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা (Regulatory Failure) এবং এর সম্পূর্ণ দায় বাংলাদেশ ব্যাংককেই নিতে হবে ।
ইতোমধ্যে ছয়টি শান্তিপূর্ণ নীরব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা এই সংগঠনটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত দাবি মেনে লিখিত সরকারি আদেশ জারি না হবে এবং প্রতিটি আমানতকারী তাদের পূর্ণ টাকা ফেরত না পাবেন, ততক্ষণ এই আইনি ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে ।