অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ঢাকা: টানা তিন বছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দাভাব কাটানো এবং বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের জন্য বিশাল অংকের এক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ শীর্ষক এই প্যাকেজের মোট আকার ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশে ২৫ লাখেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উচ্চ সুদের চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও রপ্তানি চাহিদা হ্রাসের মুখে দেশের মূল শিল্প খাতগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এই প্যাকেজে থাকছে এক বিশেষ সুদ ভর্তুকি সুবিধা।
শনিবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই বিশেষ প্যাকেজের বিস্তারিত তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, হাবিবুর রহমান এবং ড. মো. কবির আহমেদসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্যোক্তাদের জন্য মাত্র ৪% কার্যকর সুদহার
ঋণ বিতরণ ও সুদের কাঠামো ব্যাখ্যা করে গভর্নর জানান, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই প্যাকেজের আওতায় সাধারণ বাজারদরে ১০ থেকে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। তবে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ওপর সুদের বোঝা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ভর্তুকি (ইন্টারেস্ট সাবসিডি) প্রদান করবে। এর ফলে ঋণগ্রহীতা উদ্যোক্তাদের কার্যকরভাবে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন ঠেকানোর চেষ্টা
“গত তিন বছরে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির ধীরগতির মুখোমুখি হয়েছে,” প্রণোদনা প্যাকেজটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে গভর্নর মো. মোশতাকুর রহমান বলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগে যেখানে ৫.৮ শতাংশ ছিল, তা পরবর্তীতে ৪.২ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবছরে এটি আরও কমে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গভর্নর বলেন, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির এই মন্দা দেশের প্রধান শিল্প খাতগুলোতে বড় আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি), টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) খাত তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
“এর পাশাপাশি আমাদের ব্যাংকিং খাতের ওপরও চাপ বাড়ছে। খেলাপি ঋণ (এনপিএল) বৃদ্ধি, অর্থপাচারের ঘটনা এবং আমানতকারীদের আস্থার অভাব একটি দৃশ্যমান সংকট তৈরি করেছে,” ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলোকে এই বিশেষ উদ্যোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন গভর্নর।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ বাণিজ্যিক সুদের হারের কারণে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছিলেন। “এই সংকটজনক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে এবং দেশের আর্থিক ইকোসিস্টেমে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার এই বিশেষ স্কিম চালু করেছে।”
প্রণোদনা তহবিলের দ্বিমুখী কাঠামো
মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ না বাড়িয়ে বাজারে প্রয়োজনীয় লিকুইডিটি বা তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলকে দুটি প্রাথমিক উৎসে ভাগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক:
- পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (৪১,০০০ কোটি টাকা): এই অংশটি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত তারল্য (Excess Liquidity) থেকে ৩ বছর বা তার বেশি মেয়াদের দীর্ঘমেয়াদি আমানতের মাধ্যমে ১০ শতাংশ সুদে সংগ্রহ করা হবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সম্পদ (১৯,০০০ কোটি টাকা): এই অংশটি সরকারের আনুষ্ঠানিক গ্যারান্টির বিপরীতে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা হবে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা
এই প্রণোদনা প্যাকেজে বন্ধ বা সংকটে থাকা কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি সচল করার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ—২০,০০০ কোটি টাকা—বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের (Closed Industry & Service Sector) জন্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই অর্থায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বন্ধ থাকা বা সীমিত সক্ষমতায় চলা কারখানাগুলো পুনরায় চালু হতে পারবে, পেন্ডিং থাকা রপ্তানি আদেশ পূরণ করতে পারবে এবং সরাসরি ২ লাখ শ্রমিকের পুনরায় কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের (৪১,০০০ কোটি টাকা) আওতায় অন্যান্য মূল বরাদ্দগুলো হলো:
- কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড: ১০,০০০ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রা: ৯ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি)।
- সিএমএসএমই খাত: ৫,০0০ কোটি টাকা (ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজগুলোর কার্যকরী মূলধন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি)।
- উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব (North Bengal Agricultural Hub): উত্তরবঙ্গে কৃষি উৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষায়িত ৩,০০০ কোটি টাকা।
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ (Export Diversification): অপ্রচলিত ও নতুন পণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানির পরিধি বাড়াতে ৩,০০০ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত ও অবহেলিত খাতের জন্য সরাসরি সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব ১৯,০০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ চেইনের জন্য আলাদা ঋণ সুবিধা তৈরি করেছে:
- কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তা: ৫,০০০ কোটি টাকা।
- রপ্তানি খাতের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট: ৫,০০০ কোটি টাকা (বাণিজ্য অর্থায়নের ঘাটতি মেটাতে)।
- ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য: চামড়া, পাদুকা (ফুটওয়্যার), হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪,০০০ কোটি টাকা।
- যুব ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান: তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল হিসেবে বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে যুব ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে ১,০০০ কোটি টাকা করে মোট ২,০০০ কোটি টাকা।
- সৃজনশীল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ: প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রসারে যথাক্রমে ৫০০ কোটি টাকা করে মোট ১,০০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই সামগ্রিক প্যাকেজটি বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শিল্প উৎপাদনে গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে প্রেরণের ফলে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে এবং আমদানি ব্যয় সামাল দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।