নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডি ইকোনমি ঢাকা: সরকারের বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অগ্রিম আয়করের (এআইটি) মতো পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের মূল্যস্ফীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও খাত বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার রাজধানীর কাওরানবাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত “পরোক্ষ করের উপর অতি নির্ভরশীলতা: অর্থনীতির উপর বহুমুখী প্রভাব” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি (SMAC) অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া (এফসিএ)। গোলটেবিল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। এতে অর্থনীতিবিদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।
কর কাঠামোতে চরম বৈষম্য মূল প্রবন্ধে স্নেহাশীষ বড়ুয়া দেখান যে, বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারের বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের অংশ মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, “পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পরোক্ষ কর সরকারের মোট কর রাজস্বের ৫০ শতাংশের নিচে হলেও আমাদের দেশে বর্তমানে এটি প্রায় ৮০ শতাংশ—যা পুরো এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।” এনবিআর আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কর আহরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সহজ পথ হিসেবে পরোক্ষ করের ওপর এই নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া তাঁর উপস্থাপনায় যুক্তি দেন যে, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) তাত্ত্বিকভাবে প্রত্যক্ষ কর হলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি পরোক্ষ কর হিসেবেই কাজ করে। পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে ৫% অগ্রিম কর আরোপ করা হয়। একাধিক পর্যায়ে এই কর আরোপের ফলে এটি এক ধরণের ‘দ্বৈত কর’ হিসেবে রূপ নেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর বড় ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি একক ভ্যাট হারের পরিবর্তে বহুমাত্রিক ভ্যাট হার প্রণয়নের প্রস্তাব করেন।
সংস্কার ও ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিতের তাগিদ আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন বলেন, ভ্যাট হার কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত কর সংস্কার টাস্কফোর্স সর্বোচ্চ ভ্যাট হার ১০ শতাংশ করাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছিল, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আলোচনা বা সিদ্ধান্তের বাইরে রয়ে গেছে। ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়কর—এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা না গেলে শুধু ডিজিটাইজেশন করে কোনো লাভ হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের সমন্বয় দরকার। “শুধুমাত্র রাজস্ব আহরণ বাড়ালেই হবে না, রাজস্ব খরচের গুণগত বিষয়ের দিকেও নজর দিতে হবে।” দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারি পে-স্কেলের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করা এই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচকরা একমত হন যে, পরোক্ষ করের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা কেবল মূল্যস্ফীতিই বাড়াচ্ছে না, বরং ব্যবসার ব্যয় (কস্ট অব বিজনেস) বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে।
ভয়েস ফর রিফর্মের বাজেট প্রস্তাবনা গোলটেবিলের সঞ্চালক ফাহিম মাশরুর ভয়েস ফর রিফর্মের পক্ষ থেকে আগামী জাতীয় বাজেটে বিবেচনার জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন:
সাধারণ ভ্যাট হার ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা।
বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ বা তার বেশি ভ্যাট হার প্রণয়ন করা।
ব্যবসার অগ্রিম আয়কর মূল্যায়ন করা, যাতে কোনোভাবেই অগ্রিম করের পরিমাণ প্রযোজ্য কর্পোরেট ট্যাক্সের চেয়ে বেশি না হয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।
মোবাইল টক টাইমের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাতিল করা।
করের আওতা বাড়িয়ে বাজেটে প্রত্যক্ষ করের অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র্যাপিড (RAPID)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রাক্তন হেড অব ট্যাক্স সাঈদ আহমেদ খান, ভ্যাট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. আব্দুর রউফ এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালাসহ অন্যন্যরা।