নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : বাংলাদেশের প্রধান শ্রমঘন খাত তৈরি পোশাক এবং চাতাল শিল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও ‘সবুজ রূপান্তর’ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। সোমবার রাজধানীর হোটেল এশিয়ায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং তারা ক্লাইমেট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই আহ্বান জানানো হয়।
সভায় “বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং চাতাল শিল্পে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবুজ ও ন্যায্য পরিবর্তনের বাস্তব অবস্থা” শীর্ষক একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ৪১৫ জন শ্রমিকসহ প্রায় ৫৫০ জন অংশীদারের মতামতের ভিত্তিতে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণ: সচেতনতার অভাব ও চাতাল শিল্পের সংকট
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৬.৭% শ্রমিক সবুজ জ্বালানি সম্পর্কে জানেন না এবং ৬১.৮% শ্রমিক ‘ন্যায্য রূপান্তর’ (Just Transition) ধারণাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপরিচিত। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে:
- জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্রীষ্মের কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
- চাতাল শিল্পের করুণ দশা: আধুনিক অটো রাইস মিলের দাপটে সনাতনী চাতাল শিল্পের ৯৫ শতাংশই এখন বন্ধের পথে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে রিকশা চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
- সবুজ কারখানা বনাম শ্রমিক অধিকার: দেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক ‘লিড সার্টিফাইড’ গ্রিন ফ্যাক্টরি থাকলেও, সেখানে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা এবং উৎপাদনশীলতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের বক্তব্য
বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মেসবাহউদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।
ড. এম আবু ইউসুফ (অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন, “পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। সবুজ রূপান্তর যেন কেবল অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না থাকে।”
এলিসা বেনিস্টান্ত ফ্রেমিগাচি (টেকনিক্যাল অফিসার, আইএলও) জানান, পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রূপান্তরটি যেন সবার জন্য ‘ন্যায্য’ হয় এবং শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে।
টিইউসি নেত্রী সাহিদা পারভীন শিখা নারী শ্রমিকদের দ্বিগুণ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারীরাই কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের প্রথম শিকার হন। তাঁদের জন্য বিশেষ সুরক্ষানীতি প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ করণীয়
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, সরকার ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই বিশাল পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা একমত হন যে, সরকার, মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই কেবল একটি ‘ন্যায্য রূপান্তর’ বা জাস্ট ট্রানজিশন সম্ভব।