আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০২৫ সালটি ছিল প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এক স্মরণীয় বছর। ডাইনোসরের পদচিহ্ন থেকে শুরু করে মানুষের আগুন ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ—সব মিলিয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার বছরের ইতিহাস নতুনভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
১. বলিভিয়ায় ডাইনোসরের বিশাল ‘পদচিহ্ন মেলা’
বলিভিয়ার তোরোতোরো ন্যাশনাল পার্কের কারেরাস পাম্পায় বিজ্ঞানীরা ১৬,৬০০টি ডাইনোসরের পদচিহ্ন এবং ১,৩৭৮টি সাঁতার কাটার চিহ্ন আবিষ্কার করেছেন। প্রায় ৭,৪৮৫ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই স্থানে ডাইনোসরের পায়ের ছাপের সংখ্যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত যে কোনো একক এলাকার মধ্যে সর্বোচ্চ। ধারণা করা হচ্ছে, ১৪ থেকে ৬ কোটি বছর আগে বসবাসকারী ‘থেরোপড’ প্রজাতির ডাইনোসরের এই ছাপগুলো ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ।
২. ইংল্যান্ডে ৪০০,০০০ বছর আগে আগুনের ব্যবহার
বিস্ময়কর এক আবিষ্কারে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানুষ সচেতনভাবে আগুন জ্বালানোর কৌশল শিখেছিল আজ থেকে প্রায় ৪ লাখ বছর আগে। পূর্ব ইংল্যান্ডের সাফোকের বার্নহ্যাম প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় পোড়ামাটি, তাপের কারণে ফেটে যাওয়া কুড়াল এবং আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরির জন্য ব্যবহৃত ‘আয়রন পাইরাইট’ পাথরের টুকরো পাওয়া গেছে। এর আগে ধারণা করা হতো মানুষ মাত্র ৫০ হাজার বছর আগে আগুন জ্বালানোর কৌশল রপ্ত করেছিল।
৩. স্পেনে তিমির হাড়ের সরঞ্জাম (২০,০০০ বছর আগে)
স্পেনের বিস্কে উপসাগর এবং বাস্ক অঞ্চলের সান্তা কাতালিনা গুহায় ২০,০০০ বছরের পুরনো তিমির হাড় দিয়ে তৈরি ১৭৩টি সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি এবং রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, আদিম মানুষ ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস আমাদের ধারণার চেয়েও প্রাচীন।
৪. ভারতের কীলদিতে প্রাচীন নগরায়নের প্রমাণ
তামিলনাড়ুর কীলদি গ্রামে ১০টি খনন কার্য চালিয়ে ১৫,০০০-এর বেশি প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২,৫০০ বছরের পুরনো মুদ্রা, পুঁতি এবং উন্নত ড্রেনেজ সিস্টেম বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখানকার আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতেও সেখানে এক উন্নত এবং শিক্ষিত সমাজ ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীলদিতে পাওয়া ‘তামিল ব্রাহ্মী’ লিপি অশোকান লিপি থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তৈরি হয়েছিল।
৫. ইতালির পম্পেই: ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ফিরেছিল জীবন
খ্রিস্টীয় ৭৯ অব্দে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পম্পেই শহর নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, অগ্ন্যুৎপাতের পরে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ পুনরায় শহরে ফিরে এসেছিলেন এবং ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই বসবাস শুরু করেছিলেন। তাদের বসবাসের অবকাঠামো আধুনিক রোমান শহরের মতো ছিল না; তারা ছাই থেকে বাঁচতে ভবনের ওপরতলায় বসবাস করতেন এবং নিচতলা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
৬. মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্কের নতুন বয়স
ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্ক ১০,০০০ বছর নয় বরং ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল। প্রাচীন মিশরে বিড়ালকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হতো এবং তাদের মমি করা হতো। এই গবেষণায় দেখা গেছে, জাহাজ থেকে ইঁদুর তাড়ানোর কাজে ব্যবহারের মাধ্যমেই বিড়ালরা ইউরোপ ও সিল্ক রোড হয়ে চীনে ছড়িয়ে পড়ে।
৭. অস্ট্রেলিয়ায় ধারালো দাঁতওয়ালা তিমির জীবাশ্ম
অস্ট্রেলিয়া উপকূলে ২৬ মিলিয়ন (২ কোটি ৬০ লাখ) বছর আগের একটি শিকারী তিমির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। ‘জাঞ্জুসেটাস ডুলার্ডি’ (Janjucetus dullardi) নামের এই প্রজাতিটি বর্তমানের দাঁতহীন তিমির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এটি আকারে মাত্র ২ মিটার হলেও এর ছিল ভয়ংকর ধারালো দাঁত।
৮. ভিয়েতনামে বিশ্বের প্রাচীনতম মমি (১৪,০০০ বছর আগে)
ভিয়েতনামে ১৪,০০০ বছরের পুরনো মমিকরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রাচীনতম। এর আগে উত্তর চিলির ৭,০০০ বছর এবং মিশরের ৪,৫০০ বছরের পুরনো মমিকে সবচেয়ে প্রাচীন ধরা হতো। গবেষণায় দেখা গেছে, সে সময়ের মানুষ মৃতদেহকে আগুনের ধোঁয়ায় শুকিয়ে (Smoking method) সংরক্ষণ করত।