ঢাকা, ২১ অক্টোবর (বিডি ইকোনমি): ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা–মীম গ্রুপের বিশাল পোশাক কারখানায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিরামহীন ব্যস্ততা। গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসি পেনি–এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ডেনিম কাপড় কেটে নিখুঁত মাপের জিনস, স্কার্ট ও জ্যাকেট তৈরিতে ব্যস্ত কর্মীরা। মাসে প্রায় ৯৩ লাখ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী এই কারখানাটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের বিশাল সক্ষমতারই এক প্রতীক।
তবে এই কর্মযজ্ঞ প্রায়ই বাধার মুখে পড়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলেই কারখানাটি সাময়িক অন্ধকারে ডুবে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে বিশাল ক্ষমতার ডিজেল জেনারেটর।
কারখানাটির এই জ্বালানি অনিশ্চয়তা মূলত দেশের একটি বড় জাতীয় সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। অভ্যন্তরীণ গ্যাস সঞ্চয় কমতে থাকায় বাংলাদেশ বর্তমানে তার মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকই আমদানির ওপর নির্ভর করে মেটায়। তবে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে গত জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে গেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, জ্বালানি খাত বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং এটি রাজনৈতিক ঐক্যেরও একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ভূরাজনীতির টানাপোড়েন ও জ্বালানিসংকট এই সংকটের পেছনে ভূরাজনৈতিক জটিলতারও বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যা দেশের বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা বাড়িয়েছে—কারণ বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। একই সঙ্গে রাশিয়া সমর্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ ইউক্রেন যুদ্ধজনিত লেনদেন ও সরবরাহ জটিলতায় বারবার বিলম্বিত হয়েছে। যদিও গত ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং ডিসেম্বরে চালুর লক্ষ্য রয়েছে, তবুও এর পূর্ণ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা অর্জনে আরও কয়েক মাস পরীক্ষা-চলাতে হবে। পাশাপাশি, চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের আলোচনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভরতা অর্জনে সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে, যার ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। হা–মীম গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ২৯.২ মেগাওয়াট ক্ষমতার দেশের অন্যতম বৃহৎ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করলেও, কারখানার সার্বক্ষণিক চাহিদার তুলনায় তা কেবল কয়েক ঘণ্টার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও পোশাক খাতের চ্যালেঞ্জ ইত্যবসরে, জ্বালানিসংকটের মধ্যেই হা–মীম গ্রুপের কারখানায় পোশাকের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিগত তিন বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া চার শতাধিক ছোট কারখানার কিছু ক্রয়াদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কনীতির কারণে চীন থেকে সরে আসা কিছু ক্রেতার কাজ এখন তাদের হাতে আসছে। কিন্তু এর বিপরীতে হা–মীমের দৈনিক জ্বালানি বিল দুই লাখ ডলার থেকে বেড়ে তিন লাখ ডলারে দাঁড়ালেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি নন।
ভিয়েতনামের, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে কারখানাগুলো তাই উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে মরিয়া। হা–মীমের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মঈন জানান, বাহ্যিক ধাক্কা ও সংকট সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদনশীলতা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
অন্যদিকে, পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকেও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও সবুজ উৎপাদনের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আশা প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান সরকারের জ্বালানি কৌশল বাস্তবায়িত হলে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিদ্যুতের সংকট কেটে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে হুথিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক তেলবাজারকে অস্থিতিশীল করে রাখায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিদিন ২২ হাজার পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, “বর্তমান প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না থাকলে পরিস্থিতি অনেক বেশি অনুকূল হতে পারত।”