সোমবার ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ:
গণভোটের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে: তথ্য উপদেষ্টা পল্লী বিদ্যুতের ৩ কোটি ৭২ লাখ গ্রাহকের কাছে যাবে ‘হ্যাঁ’ লিফলেট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ খাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা চালানো হবে আইসিএমএবি’র নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন মো. কাওসার আলম জলবায়ু পরিবর্তন ও ট্রাম্প: গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বনাম বাস্তবতা গ্রিনল্যান্ড কিনতে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের ১০% শুল্ক আরোপের ঘোষণা লগারহেড কচ্ছপ ‘গুমুশ’-এর বিস্ময়কর যাত্রা: সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিই কি কারণ?

সুশাসনের অভাবে লক্ষ্যচ্যুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত: টিআইবির গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা : বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য উৎসের রূপান্তর গভীর সংকটে পড়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার যে বৈশ্বিক ও জাতীয় লক্ষ্য রয়েছে, সুশাসনের অভাব ও নীতিগত অসংগতির কারণে তা অর্জনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।আজ বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

মো. নেওয়াজুল মওলা, কোঅর্ডিনেটর এনার্জি গভার্নেন্স ও আশনা ইসলাম, এ্যাসিস্ট্যান্ট কোঅর্ডিনেটর এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেন। টিআইবির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

প্রফেসর ড. সুমাইয়া খায়ের, এডভাইজার ম্যানেজমেন্ট অফ টিআইবি ও মোহাম্মদ বলিউজ্জামান ডাইরেক্টর রিসার্চ এন্ড পলিসি অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

Oplus_131072

প্রতিবেদনটিতে অক্টোবর ২০২৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জ্বালানি খাতের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আর গবেষণার আওতায় আনা হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০২৫ সময়ে প্রণীত আইন, নীতি ও পরিকল্পনাকে।

বিনিয়োগ ও সক্ষমতায় ব্যাপক বৈষম্য গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮,৬১৬.৫ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ১,৩১৪.৭ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার মাত্র ৪.৬ শতাংশ।বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে চরম বৈষম্য। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই খাতে আসা ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ৯৬.৭ শতাংশই ব্যয় হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে মাত্র ৩.৩ শতাংশ অর্থ। টিআইবি মনে করে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর এই অতিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় অসংগতি ও অস্পষ্টতা২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যৎ উৎপাদনে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালের ভিশনসহ নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন- বিভিন্ন নথিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় ভিন্নতা: প্যারিস চুক্তি, জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অনুমিত অবদান (আইএনডিসি) সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ- নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার ফলে নীতিগত অস্পষ্টতা, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থতাইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি), ২০২৩ এ স্পষ্ট নবায়নযোগ্যজ্বালানির রূপান্তর পরিকল্পনার অভাব- নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে ক্লিন এনার্জি যেমন- পারমাণবিক, কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজ ইউনিট এবং তুলনামূলকভাবে নতুন ও অপরিক্ষিত প্রযুক্তি হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়াকে অগ্রাধিকার প্রদান২০৫০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এবং বাকি ৩০ শতাংশ অন্যান্য ক্লিন এনার্জি উৎস থেকে

সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত দুর্বলতা গবেষণা প্রতিবেদনে এই খাতের স্থবিরতার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব: দাতা সংস্থা ও প্রভাবশালী মহলের চাপে জ্বালানি নীতিসমূহ জীবাশ্ম জ্বালানিঘেঁষা হয়ে পড়ছে। এতে করে উচ্চাভিলাষী বিদ্যুৎ চাহিদার কথা বলে অপ্রয়োজনীয় জীবাশ্মভিত্তিক কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় (ক্যাপাসিটি চার্জ) হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-কে প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। ফলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।

দরপত্র ও চুক্তিতে স্বচ্ছতার অভাব: ক্রয় প্রক্রিয়া ও দরপত্র আহ্বানে অস্বচ্ছতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত বড় বড় কর্পোরেট উদ্যোক্তাদের হাতে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন: প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণের সময় স্থানীয় জনগণের ওপর নির্যাতন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা বিচার পাচ্ছেন না, যা অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।

টিআইবির সুপারিশ ও সামনের পথ টিআইবি মনে করে, বর্তমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য বিদেশের ওপর অতিনির্ভরতা এই খাতের প্রসারে প্রধান বাধা। ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নীতি কাঠামোতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। একইসাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’ (Just Transition) নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।

বর্তমানে দেশে ১২২১.৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাত্র ১৭টি গ্রিড সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি চলমান আছে। এটি জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ চক্রের মাত্র ৪.৬ শতাংশ।

টিআইবি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেক্টর এর জন্য যেসব সুপারিশ করেছে –

১. জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিদ্যমান জ্বালানি মহাপরিকল্পনা ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইপিএমপি ২০২৩) অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস এবং জ্বালানি মিশ্রণে নবানয়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বৃদ্ধি-এমন মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি ও কার্যকর করতে হবে

২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫সহ বিদ্যমান সকল নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে

৩. বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ এর সংশোধন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আইনি ভিত্তি প্রদান করতে হবে এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের/বিকল্প গ্রিডের মাধ্যমে সঞ্চালন, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করতে হবে

৪. শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজীকরণ, ফিড-ইন-ট্যারিফ কার্যকর এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে

৫. জ্বালানি খাতে নীতি করায়ত্ত বন্ধ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধসহ এ খাত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে

৬. সকল প্রকার জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ত্রুটিমুক্ত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও যাচাই নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান এবং দূষণ ও পরিবেশ-বিষয়ক তদারকিতে স্বচ্ছ ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে

৭. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর-সংক্রান্ত কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-কে একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদানসহ এর কারিগরি, জনবল এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; জেলা/আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে