নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বিশ্ব বাণিজ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারকের অবস্থান দখল করেছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের আরোপিত কঠোর ‘পাল্টা শুল্কের’ (Counter-tariffs) চাপে চীনের বাজার হিস্যা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও বিশ্বজুড়ে পোশাকের চাহিদা বর্তমানে কিছুটা মন্থর।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল’ (অটেক্সা)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে বিশ্ববাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১১.৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭.৭৩ বিলিয়ন ডলারে। বড় সব উৎপাদনকারী দেশের রপ্তানি কমলেও চীনের রপ্তানির নজিরবিহীন পতনে বাংলাদেশ র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ উপরে উঠে এসেছে।
শুল্ক যুদ্ধের প্রভাব: চীন বনাম বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮.৩৮ শতাংশ কমে ২০৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে চীনের রপ্তানি বিস্ময়করভাবে ৫২.৯১ শতাংশ কমে মাত্র ১৬৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া পারস্পরিক শুল্ক আরোপের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের ওপর। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের জন্য নির্ধারিত পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
শীর্ষস্থানে এখনো ভিয়েতনাম
বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এলেও শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। শীর্ষ পাঁচটি রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে একমাত্র ভিয়েতনামই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। আলোচ্য সময়ে দেশটির রপ্তানি ২.৭৭ শতাংশ বেড়ে ৩৯৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারের ২২ শতাংশ ভিয়েতনামের দখলে, যেখানে বাংলাদেশের অংশ ১১.৫ শতাংশ।
আঞ্চলিক তুলনামূলক চিত্র (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬):
| দেশ | রপ্তানি আয় | প্রবৃদ্ধি (মান) | অবস্থান |
| ভিয়েতনাম | ৩.৯৮ বিলিয়ন ডলার | +২.৭৭% | ১ম |
| বাংলাদেশ | ২.০৪ বিলিয়ন ডলার | -৮.৩৮% | ২য় |
| চীন | ১.৬৯ বিলিয়ন ডলার | -৫২.৯১% | ৩য় |
| ইন্দোনেশিয়া | ১.২২ বিলিয়ন ডলার | -০.১৩% | ৪র্থ |
| ভারত | ১.১০ বিলিয়ন ডলার | -২৭.০১% | ৫ম |
সতর্ক অবস্থানে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা
এই অর্জনকে মাইলফলক হিসেবে দেখলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখনই অতি-উৎসাহী হতে নারাজ। সংশ্লিষ্ট এক শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, “বাংলাদেশ দ্বিতীয় হয়েছে আমাদের পারফরম্যান্স খুব বেশি বাড়ার কারণে নয়, বরং চীনের রপ্তানি আমাদের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে কমার কারণে।”
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং পণ্যের একক প্রতি দর (Unit price) ২.৫৬ শতাংশ কমার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। পাশাপাশি কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো ১৭.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সংক্রান্ত আইনি জটিলতার চূড়ান্ত সমাধান এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের মাধ্যমে পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়াই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।