অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, পরিবর্তন ও সামগ্রিক সংস্কার কার্যক্রম একটি স্বাধীন কমিশনের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ইআরএফ।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, “গণমাধ্যম, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যখন ইতিমধ্যেই সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে, তখন ব্যাংকিংয়ের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত কেন এর বাইরে থাকবে? আমরা অবশ্যই এই খাতের সংস্কারে স্বাধীন কমিশন গঠন করব।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসনকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির চেয়ে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে, কেবল গণমাধ্যমের নজরদারি দিয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব।
বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জহির উদ্দিন স্বপন অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী শাসনামলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, নিয়মতান্ত্রিক তথ্য কারচুপি ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত বড় পরিসরে পারফরম্যান্স সূচক ও পরিসংখ্যান পরিবর্তন করা অসম্ভব।
দেশের অর্থনীতির ঐতিহাসিক প্রবৃদ্ধির কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে অর্থনৈতিক উদারীকরণের সূচনা করেছিলেন, যা আজকের বেসরকারি খাতের প্রসারের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তথ্যমন্ত্রী। আর্থিক প্রতারকদের একটি চক্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যারা ব্যাংকের আমানত আত্মসাৎ করেছে, তারাই আবার শেয়ার বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটপাট করেছে।”
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশীদ বলেন, ব্যাংকিং খাত দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলেও, দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাব এই খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউসিবি-ও আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
মামদুদুর রশীদ উল্লেখ করেন, খেলাপি ঋণের (এনপিএল) প্রকৃত তথ্য দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকৃত তথ্য প্রকাশের নির্দেশনার পর প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এক বছরের কোনো আকস্মিক অবনতি নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যার সম্মিলিত রূপ।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থায়নের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংকিং খাত। দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে না পারায় ব্যাংকগুলোকেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের সিংহভাগ জোগান দিতে হচ্ছে। ফলে পুরো অর্থনীতির স্থায়িত্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুশাসনের ওপর ওতপ্রোতভাবে নির্ভরশীল।
প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে কাজ করে। তবে বিগত সরকারগুলো গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে প্রায়শই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন সমকালের বিশেষ সংবাদদাতা ওবায়দুল্লাহ রনি এবং প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ সাকিব।
ইআরএফ সভাপতি দোয়াত আক্তারের সভাপতিত্বে সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-উপাচার্য সায়েমাহ হক বিদিশা।