ঢাকা, ৯ আগস্ট (বিডিইকোনমি)- দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় আকারের খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বিদেশে অবস্থানরত ঋণখেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত ও বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
উদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের বিদেশে পাচার করা অর্থ এবং গড়ে তোলা সম্পদ খুঁজে বের করতে এবং তা আইনি উপায়ে ফ্রিজ (জব্দ) করে দেশে ফেরত আনতে জোর আইনি পদক্ষেপ শুরু করেছে।
প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে এই অভিযানের আওতায় আনা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধান ও উদ্ধারে কাজ করছে আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাদার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
রবিবার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণে খেলাপি হওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি অনেক ঋণগ্রহীতা বা তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দেশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও তা বিক্রির মাধ্যমে পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরও জানান, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। যেসব দেশে অর্থ বা সম্পত্তি পাচার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী কোনো সম্পদ উদ্ধার সম্ভব হলেই কেবল উদ্ধার করা অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ওই প্রতিষ্ঠানকে পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদান করা হবে।
প্রথম ধাপে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রথম ধাপে জোর দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
একই সাথে ব্যাংকের খেলাপি পাওনা আদায়ে বিদেশি আইন ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ধাপের কার্যক্রমে যুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন (Grant Thornton), আরআই কনসোর্টিয়াম (RI Consortium), বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি (Baker McKenzie & PwC), ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল (DLA Piper & Kroll), ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস (EY & Dentons), রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ (Rahman Ravelli & Interpath), হোয়াইট অ্যান্ড কেস (White & Case) এবং ডেলয়েট (Deloitte)।
দ্বিতীয় ধাপে ৪২ বড় খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দ্বিতীয় ধাপে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান ও মালিকানা নিশ্চিত করতে আটটি বিদেশি আইন ও পেশাদার সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর (BCG & HHR) এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস (Ananimus Associates)।
ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দীর্ঘ দিন ধরে বিপুল অঙ্কের ঋণ পরিশোধ না করা অনেক খেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা চলছে। তবে শুধু দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করে পুরো বকেয়া উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি অনেক ঋণের টাকা বিদেশে পাচারের বা খেলাপিদের বিদেশে অবস্থান করার সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
এ কারণে দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিদেশে তাদের সম্পদ স্থগিত বা বাজেয়াপ্ত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১২টি দেশে চলছে অনুসন্ধানী নজরদারি
প্রাথমিকভাবে যেসব দেশে পাচারকৃত অর্থ বা সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, এমন ১২টি দেশকে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। দেশগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি সংস্থাগুলো এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে থাকা সম্পদের ধরন, অবস্থান এবং বর্তমান বাজারমূল্য যাচাই করছে। সম্পদের সন্ধান মিললেই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে তা স্থগিত বা ফ্রিজ করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
পরবর্তী পর্যায়ে আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় আইন অনুযায়ী এসব সম্পদ নিষ্পত্তি করে সমুদয় অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে।
‘উদ্ধার সাপেক্ষে পারিশ্রমিক’ নীতি
আন্তর্জাতিক এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে “নো রিকভারি, নো ফি” (উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়) নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে কাজ শুরু করার জন্য ব্যাংকগুলোকে শুরুতেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা গুনতে হচ্ছে না।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান সফলভাবে সম্পদ শনাক্ত ও তা উদ্ধার করতে সক্ষম হলেই কেবল সংগৃহীত অর্থের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে বিদেশে থাকা সম্পদ জব্ধ ও বিক্রির এই আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য এক নতুন আশার আলো তৈরি করেছে।