ঢাকা, ৬ আগস্ট (বিডিইকোনমি)— বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি দ্রুত দূর করতে পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলো মাত্র এক দশকেই এক শতাব্দীর সমপরিমাণ অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তৈরি প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নভিত্তিক এই প্রতিবেদনের নাম—‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি অনেকটাই কম। তবে এআইয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোও প্রায় উন্নত বিশ্বের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুবিধা পেতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এআইয়ের স্বয়ংক্রিয়করণের (অটোমেশন) কারণে মাত্র ৪.৫ শতাংশ চাকরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই ঝুঁকির হার ১৪.২ শতাংশ। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল অর্থনীতির ১৬.২ শতাংশ কর্মীর উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব, যা ধনী দেশগুলোর জন্য প্রাক্কলিত ১৮.৭ শতাংশের প্রায় কাছাকাছি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সামনে এক নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং তাদের এটি গ্রহণ করা উচিত। এই সুবিধা পাওয়ার জন্য বিশাল বড় মডেল কিংবা বড় ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন নেই। ছোট ও স্বল্পমূল্যের এআই টুলস স্থানীয় চাহিদার সাথে মানানসই করে ব্যবহারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিচারিক সেবা এবং কৃষি সম্প্রসারণ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।”
এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এলো যখন উন্নয়নশীল দেশগুলো গত তিন দশকের মধ্যে তাদের সবচেয়ে দুর্বল গড় প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছে। রিপোর্টে বলা হয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে এই দশকের শেষের আগেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরাান্বিত করা সম্ভব।
তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এই সুযোগটি এমনি এমনি বাস্তবায়িত হবে না।বর্তমানে সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তিগুলো অল্প কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে।প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে দরিদ্র দেশগুলো পিছিয়ে পড়লে বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।উদাহরণস্বরূপ, সাব-সাহারা আফ্রিকার গ্রামীণ এলাকাগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্কুলে এখনও বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্কুলে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নেই।
ডিজিটাল বৈষম্য যাতে আরও গভীর না হয়, সেজন্য প্রতিবেদনটিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তিন ধাপের একটি কৌশল তুলে ধরা হয়েছে:
১. প্রথমে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বা টুলস গ্রহণ করা (Adopt)।
২. পরবর্তীতে স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপটের সাথে মানানসই করে তার অভিযোজন করা (Adapt)।
৩. এবং সময়ের সাথে সাথে নিজস্ব উন্নত এআই ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাওয়া (Advance)।
ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এর পরিচালক গৌরব নায়ার সতর্ক করে বলেন, “এই সুযোগটি কাজে লাগানোর সময় খুবই সীমিত। যেসব উন্নয়নশীল দেশ এখনই বিদ্যুৎ, কানেক্টিভিটি, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করবে, তারাই এআই প্রযুক্তিকে নিজেদের জনগণের কল্যাণে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে।”
এছাড়াও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সঠিক প্রসারে সরকারের পক্ষ থেকে কম্পিউটিং পাওয়ার বৃদ্ধি, স্থানীয় ভাষার ডেটাসেট তৈরি, স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং তথ্য গোপনীয়তা ও পাবলিক ট্রাস্ট নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।