মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ:
অর্থবছরের সময়সূচিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন: কেন এই সিদ্ধান্ত এবং কী মিলবে সুবিধা রেমিট্যান্স প্রবাহ ২১.৬% বেড়ে ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার, মোট রিজার্ভ ৩৭.২৪ বিলিয়ন ছুঁয়েছে বেসরকারি খাতের জন্য সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ জ্বালানি সংকট: বিকেএমইএ সভাপতি দেশে প্রথমবারের মতো কম্পিটেন্সি-বেজড আরবি ভাষার কারিকুলাম প্রণয়ন করছে এনএসডিএ কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৫৪% বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করল বাংলাদেশ ব্যাংক আইডিআরএ’র নতুন সদস্য হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহি পরিচালক সিরাজুল ইসলাম দেশে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব আমিরাত প্রবাসী সিআইপি ও ব্যবসায়ীদের; ভিসা সংকট নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি ‘সার্কেল’ নামে যাত্রা শুরু করল মোবাইল অপারেটর এয়ারটেল গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটতে লাগবে অন্তত ২ বছর: অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী

অর্থবছরের সময়সূচিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন: কেন এই সিদ্ধান্ত এবং কী মিলবে সুবিধা

ঢাকা, ১৮ আগস্ট (বিডিইকোনমি) — দীর্ঘদিনের জুলাই-জুন অর্থবছর চক্র থেকে বেরিয়ে এসে এপ্রিল-মার্চ সময়সূচি চালুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।

অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সময়সূচি বাস্তবায়নে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ৯ মাসের (জুলাই-মার্চ) একটি ট্রানজিশনাল বা রূপান্তরকালীন অর্থবছর হিসেবে গণ্য করা হবে।পরবর্তী ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ‘এপ্রিল-মার্চ’ অর্থবছর পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।

কাগজে-কলমে এটি মাত্র তিন মাসের পরিবর্তন মনে হলেও, রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

প্রধান কারণ: বর্ষার বাধা অতিক্রম

অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তনের মূল কারণ দেশের আবহাওয়ার সাথে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ঘটানো। বিদ্যমান জুলাই-জুন কাঠামোতে অর্থবছরের শেষ মাসগুলো—বিশেষ করে এপ্রিল, মে ও জুন—বাজেট বাস্তবায়ন ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু জুন মাস থেকে দেশে বর্ষা শুরু হওয়ায় জলজট, নদীভাঙন ও কাদা-মাটির কারণে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ও বাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

‘জুন রাশ’ বা শেষ মুহূর্তের অর্থ খরচের প্রবণতা বন্ধ

অর্থবছরের এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দীর্ঘদিনের বহুল আলোচিত ‘জুন রাশ’ বা অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অর্থ খরচের কুঅভ্যাস বন্ধ করা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের উপাত্ত এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে: উক্ত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মোট খরচ হওয়া ১.৪১ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ৪০,০০০ কোটি টাকারও বেশি—যা মোট বরাদ্দের ২৮ শতাংশেরও বেশি—এককভাবে শুধু জুন মাসেই খরচ করা হয়েছিল। অর্থবছরের শেষ ভাগে এসে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করা এবং বিল পরিশোধের এই মানসিকতার কারণে উন্নয়ন কাজের গুণগত মান ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অপচয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

নতুন ‘এপ্রিল-মার্চ’ কাঠামোর সুবিধা:

  • প্রথম ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন):শুষ্ক মৌসুমের শেষ ভাগকে কাজে লাগিয়ে প্রকল্প দলগুলো নির্মাণ কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিতে পারবে।
  • দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর):বর্ষাকাল থাকবে অর্থবছরের শুরুর দিকে, যা অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে দ্রুত কাজ শেষ করার মানসিক চাপ দূর করবে।
  • দ্বিতীয়ার্ধ (নভেম্বর-মার্চ):টানা একটি শুষ্ক সময় মিলবে, যাতে নির্বিঘ্নে ও মানসম্মতভাবে মূল অবকাঠামো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য

অর্থবছরের এই পুনর্বিন্যাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থনৈতিক উপাত্তের তুলনা সহজ করবে। ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বড় অর্থনৈতিক শক্তি এবং যুক্তরাজ্যের মতো প্রধান বাণিজ্য অংশীদাররা দীর্ঘদিন ধরেই এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে আসছে। একই চক্রে চলে আসায় তাদের সাথে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, বাণিজ্য মূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক নীতি নির্ধারণ আরও সহজ হবে।

বাস্তবায়ন কাঠামো ও সংস্কারের তাগিদ

এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে।একই সাথে বাংলাদেশের সংবিধান ও জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সিস্টেমেও সংস্কার আনা হবে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন কাজের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে ঠিকই, তবে এর সুফল পুরোপুরি পেতে হলে ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকল্পের নিবিড় তদারকির মতো প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার আনা অত্যন্ত জরুরি।