মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ:
US cotton warehouse to launch in Chattogram in mid-November to boost bilateral trade তা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তীব্র আপত্তি<gwmw style="display:none;"></gwmw> রাজধানীতে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে ১১তম ‘বাপা ফুডপ্রো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ২০২৪’ ‘ওয়ান বাই মেটলাইফ’ অ্যাপে গ্রাহকদের জন্য নতুন ৪ ফিচার যুক্ত ২০২৮ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারে ডেরিভেটিভস চালুর লক্ষ্য: ডিএসই ঋণের জামানত মূল্যায়নে ১৩১ প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্য অর্থায়ন বাড়াতে সিটি ব্যাংকে আইটিএফসির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা ইপিজেডে দুটি আধুনিক ওয়েব্রিজ উদ্বোধন করলেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত শুরু সোমবার থেকে

যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফের টাকা ফেরত, ক্ষতিপূরণ চান বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা

মার্কিন ক্রেতারা পাচ্ছেন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার রিফান্ড; ট্যারিফের বোঝা ভাগ করে নেওয়া বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে নতুন অর্ডার, দাম বাড়ানো বা অন্যান্য সুবিধার প্রস্তাব

ঢাকা, ১১ আগস্ট (বিডিইকোনমি)-যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্কের (রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) কারণে গত বছর মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসা ধরে রাখতে যে বাড়তি ব্যয় ও মূল্যছাড়ের বোঝা বহন করেছিলেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা, এখন তার একটি অংশ ফেরত পাওয়ার দাবি উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করার পর মার্কিন সরকার আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে আদায় করা শুল্কের অর্থ ফেরত দিতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—শুল্কের বাড়তি ব্যয় সামলাতে যেসব সরবরাহকারী নিজেদের মুনাফা কমিয়েছেন কিংবা মার্কিন ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিয়েছেন, তাদের সেই ক্ষতির অংশ কি ফেরত দেওয়া হবে?

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হলেও ভবিষ্যৎ অর্ডারের দাম বাড়ানো, অর্ডারের পরিমাণ বৃদ্ধি, এয়ারফ্রেইট খরচ মওকুফ কিংবা বিভিন্ন চার্জ ও জরিমানা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ট্যারিফের বোঝা ভাগ করেছিলেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বাড়ার সময় অনেক মার্কিন ক্রেতা বাংলাদেশি পোশাক সরবরাহকারীদের পণ্যের দাম কমাতে বা মূল্যছাড় দিতে চাপ দেন। বড় ক্রেতা ও অর্ডার ধরে রাখতে অনেক রপ্তানিকারক বাধ্য হয়ে বাড়তি শুল্কের একটি অংশ নিজেদের ওপর নেন।

চট্টগ্রামভিত্তিক HKC Apparels-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ট্যারিফ সংকটের সময় তাদের প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের সঙ্গে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ভাগ করে নিয়েছিল।

তিনি বলেন, “সে সময় আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে বাড়তি মূল্যের বোঝার এক-তৃতীয়াংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেক পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছিলাম। রিফান্ড দেওয়ার ঘোষণা আসার পর আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। তারা আমাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছে।”

HKC Apparels-এর প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়। ফলে মার্কিন ট্যারিফ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছিল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়।

নগদ ফেরত নয়, অন্যভাবে ক্ষতি পোষানোর প্রস্তাব

বাংলাদেশে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, ট্যারিফের সময় যেসব বাংলাদেশি সরবরাহকারী আর্থিক চাপ নিয়েছেন, তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত। তবে সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবে জটিল হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

তাদের প্রস্তাব, ভবিষ্যতের অর্ডারে প্রতি ইউনিটের দাম বাড়ানো, অর্ডারের পরিমাণ বৃদ্ধি, এয়ারফ্রেইটের খরচ মওকুফ কিংবা বিভিন্ন ধরনের পেনাল্টি বা চার্জ প্রত্যাহারের মাধ্যমে ক্ষতি সমন্বয় করা যেতে পারে।

তবে এ ধরনের সমঝোতা সরাসরি ক্রেতা ও সরবরাহকারীর আলোচনার মাধ্যমেই হতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

‘কেটে নেওয়া টাকা কোনো না কোনোভাবে ফেরত দিতে হবে’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মূল্যছাড়ের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ কমিয়ে নিয়েছিলেন, রিফান্ডের অর্থ থেকে কোনো না কোনোভাবে সেই অর্থ সরবরাহকারীদের ফেরত দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, “সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ আটকে রাখা হয়েছিল বা কেটে নেওয়া হয়েছিল, রিফান্ডের অর্থ থেকে কোনো না কোনোভাবে তা তাদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”

তবে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বিকেএমইএ—দুই শীর্ষ সংগঠনের কাছেই ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা মোট কত টাকা নিজেদের ওপর বহন করেছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই।

এক শতাংশ মূল্যছাড়েই ক্ষতি ২৫ হাজার ডলার

ঢাকার একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের এক মার্কিন ক্রেতা পণ্যের দাম ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ১ শতাংশ দাম কমাতে সম্মত হন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে তাদের প্রায় ২৫ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা সরাসরি টাকা ফেরত চাইব না। বরং অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করব। ব্যবসার পরিমাণ বাড়লে ধীরে ধীরে এই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”

এ ধরনের কৌশলকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেকে। কারণ দীর্ঘদিনের ক্রেতা-সরবরাহকারী সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরাসরি নগদ অর্থ ফেরতের পরিবর্তে ভবিষ্যৎ ব্যবসা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

সব ক্রেতা সমান চাপ দেয়নি

বিজিএমইএর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব মার্কিন ক্রেতা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ওপর একই মাত্রায় চাপ প্রয়োগ করেননি। তবে সামগ্রিকভাবে রপ্তানিকারকদের নিজেদের বহন করা অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি জানান, বিশেষ করে ‘ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড’ (LDP) শর্তে পণ্য রপ্তানি করা সরবরাহকারীরাই তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়েছেন।

LDP চুক্তির ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশে পণ্য আমদানির শুল্ক ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় সরবরাহকারীর ওপর বর্তায়। অন্যদিকে প্রচলিত ‘ফ্রি অন বোর্ড’ (FOB) ব্যবস্থায় সাধারণত গন্তব্য দেশের আমদানি শুল্কের দায় আমদানিকারকের ওপর থাকে।

ফলে LDP ভিত্তিতে ব্যবসা করা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ওপর ট্যারিফ বৃদ্ধির সরাসরি আর্থিক চাপ বেশি পড়েছে।

‘টাকা ফেরত পাওয়ার আশা করি না’

তবে সবাই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী নন।

চট্টগ্রামভিত্তিক Meadow Apparels-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আনাম চৌধুরী বলেন, ট্যারিফের সময় তাদের মূল্যছাড় দিতে হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ কোনোভাবেই ফেরত পাওয়ার আশা করছেন না তিনি।

তার এই বক্তব্যে খাতটির একটি বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে—বৈশ্বিক পোশাক ব্যবসায় বড় ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ধরে রাখতে অনেক সরবরাহকারী সংকটের সময় মূল্যছাড় দিলেও পরবর্তীতে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা থাকে না।

দলগতভাবে কোনো আলোচনা হয়নি

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, ট্যারিফের কারণে দেওয়া মূল্যছাড় ফেরত পাওয়ার বিষয়ে রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক দলগত আলোচনার খবর তার জানা নেই।

তিনি বলেন, কেউ আলোচনা করলে তা নিজ নিজ ক্রেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে করছে। যেসব রপ্তানিকারক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তি ব্যয় বহন করেছেন, তারা সংশ্লিষ্ট ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত পাওয়া না গেলেও ভবিষ্যতে অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এখন নজর ভবিষ্যৎ অর্ডারে

বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ট্যারিফ-পরবর্তী সময়ে রিফান্ডের অর্থের কতটা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছাবে, তা শুধু ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন নয়; বরং আগামী দিনের ক্রেতা-সরবরাহকারী সম্পর্ক ও পণ্যমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি রিফান্ডের পরিবর্তে ইউনিটপ্রতি দাম সমন্বয়, অর্ডারের পরিমাণ বৃদ্ধি, এয়ারফ্রেইট ব্যয় কমানো এবং পেনাল্টি মওকুফ—এসব সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—ট্যারিফ সংকটের সময় কোন সরবরাহকারী কতটা আর্থিক বোঝা বহন করেছেন, তার গ্রহণযোগ্য হিসাব তৈরি করা এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছানো।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ রিফান্ড এখন শুধু মার্কিন আমদানিকারকদের জন্য অর্থ ফেরতের বিষয় নয়; বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্যও এটি গত বছরের মূল্যছাড় ও বাড়তি ব্যয় পুনরুদ্ধারের একটি নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ হয়ে উঠেছে।