ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর (বিডিইকোনমি) — কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের পরিবারগুলোর খাদ্য নির্বাচনের ধরন বদলে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মানুষের পুষ্টি ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রবিবার ঢাকায় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিআইএমএমওয়াইটি – সাইমিট) আয়োজিত এক কর্মশালায় এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উৎপাদন, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং বহুমুখী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যকার জটিল আন্তঃসম্পর্ক পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় ‘ফাজি কগনিটিভ ম্যাপিং’ (এফসিএম) নামের একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে কীভাবে পুষ্টিহীনতা ও ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে জলবায়ু, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির ওপর এফসিএম পদ্ধতির প্রয়োগ এটাই প্রথম।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের ‘ক্লাইমেট ইমপ্যাক্টস অ্যাওয়ার্ড’-এর অর্থায়নে “দ্য ইমপ্যাক্ট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অন নিউট্রিশন অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ইন বাংলাদেশ: ক্যাটালাইজিং পলিসি অ্যাকশন” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদী এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতি প্রণয়নে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রমাণ সরবরাহ করা।
কর্মশালা পরিচালনা করেন সাইমিটের অ্যাডাপশন, স্কেলিং অ্যান্ড ইনোভেশন সিস্টেমস বিভাগের বিজ্ঞানী ড. শ্রীজিত অরবিন্দক্ষান। এতে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা এবং ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা (ইউএনসি) চ্যাপেল হিলের ড. কেলা কনরস।
আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতার কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজারে খাদ্যের পর্যাপ্ততা কমে যায়, যা সাধারণ পরিবারের দৈনিক খাদ্যতালিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে মাছ নির্ভর প্রোটিন গ্রহণ, সুপেয় পানির সংস্থান এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য নির্বাচনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুষ্টির ওপর সৃষ্ট প্রভাব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে পরিবারভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা সতর্ক করে বলেন, খাদ্যভ্যাসের এই পরিবর্তনের কারণে দেশে একই সাথে অপুষ্টি এবং স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের মতো দ্বিমুখী স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তরের ড. সুবর্ণা ফেরদৌস জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের বৈচিত্র্য ও অ্যাকুয়াকালচার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রোটিনের সহজলভ্যতা কমতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিচ্ছন্ন ও শীতল খাবার পানির ব্যবস্থা, কৃষি-বনায়ন (অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি) সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির মতো খাপ খাওয়ানোর নানা কৌশলের ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষকরা স্পষ্ট করেন যে, এই মানচিত্রায়ন মূলত অংশীদারদের প্রাপ্ত মতামতভিত্তিক একটি বিশ্লেষণ মূল্যায়ণ, যা কোনো রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ বা সংক্রমণের হার নির্ধারণ করে না। প্রকল্পটি যৌথভাবে পরিচালনা করছেন ইউএনসি চ্যাপেল হিলের অধ্যাপক লিন্ডসে স্মিথ টাইলি ও অধ্যাপক মৃধা। সাইমিট ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এতে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।