মঙ্গলবার ২ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ:
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিতে প্রতি তিন টাকার এক টাকা<gwmw style="display:none;"></gwmw> ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই জনকল্যাণমুখী বাজেট তৈরির চেষ্টা: আমীর খসরু<gwmw style="display:none;"></gwmw><gwmw style="display:none;"></gwmw> স্মার্ট কার্ডধারী ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিঋণে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডি ইকোনমি এস আলমের সম্পদ বিক্রি করে ইসলামী ব্যাংকের লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারের দাবি গ্রাহকদের ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত শতাধিক মে মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৫.৩৪ শতাংশের বিশাল প্রবৃদ্ধি; চলতি অর্থবছরে এসেছে ৩২.৭৫ বিলিয়ন ডলার রাস্তায় আন্দোলন করে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানকে সরানো যাবে না: বাংলাদেশ ব্যাংক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশজুড়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত আইএমএফের সঙ্গে নতুন ৪০০-৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাতিল হচ্ছে চলমান তহবিল

ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই জনকল্যাণমুখী বাজেট তৈরির চেষ্টা: আমীর খসরু

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডি ইকোনমি

ঢাকা, ২ জুন ২০২৬ : দেশে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য বিমোচন, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোই প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের মূল লক্ষ্য। অত্যন্ত প্রতিকূল ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইআরএফ মিলনায়তনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমনস্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন।

অর্থমনস্ত্রী বলেন, “ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় একটি জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ ছিল, যেখানে সাধারণত এই প্রক্রিয়ার জন্য কমপক্ষে ছয় মাস সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমাদের বাজেট পেশ করতে হচ্ছে।”

বিগত সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছি যেখানে সব সূচক ছিল নিম্নমুখী; বিনিয়োগে স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বিষয়টি ঠিক একটি টিউবওয়েল চালু করার মতো—যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার আগে উপর থেকে কিছু পানি ঢালতে হয়।”

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বাজেটের আকার নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে আমীর খসরু বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই সরকার বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বাজেটে নিম্নআয়ের এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যারা অতীতে সবসময় উপেক্ষিত থেকেছে।

ফ্যামিলি ও ফার্মার কার্ড এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাজেটের মূল কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অর্থমনস্ত্রী জানান, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় পরিবারের নারী প্রধানদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর করা হবে, যার ফলে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো সুযোগ থাকবে না। একটি পাইলট প্রকল্পে মাত্র ১ থেকে ১.৫ শতাংশ বিচ্যুতির হার পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এটি শতভাগ নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও গ্রামীণ জীবিকার মানোন্নয়নে কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকার ‘সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ (Universal Primary Healthcare) চালুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষকে তাদের আয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসার পেছনে খরচ করতে হয়। এই কর্মসূচিটি কেবল সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত এবং এনজিওগুলোর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিতে বিশেষ বরাদ্দ অর্থমনস্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কারুশিল্পী, তাঁতি, লোকশিল্পী, মঞ্চ ও থিয়েটার কর্মীসহ সাংস্কৃতিক খাতের সাথে জড়িতদের জন্য বিশেষ সহায়তার ঘোষণা দেন, যাকে তিনি ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অভিহিত করেন। থাইল্যান্ডের সফল মডেল “ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট” (একটি গ্রাম, একটি পণ্য)—এর আদলে এই জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়নের সুযোগ, নকশা সহায়তা, ব্র্যান্ডিং এবং অনলাইন বিপণনের সুযোগ দেওয়া হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কেবল শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে পরিমাপ করা ঠিক নয়; সৃজনশীল শিল্প এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। আমাদের লক্ষ্য অর্থনীতির প্রকৃত ‘গণতন্ত্রীকরণ’ করা, যাতে প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি নাগরিক ও সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছায়।

ব্যবসা সহজীকরণ ও মেগা প্রকল্প পুনর্বিবেচনা বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করে আমীর খসরু বলেন, রাষ্ট্র এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নয়, বরং সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করবে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা হবে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ করা হবে এবং নির্ধারিত সময়ে কোনো আবেদন নিষ্পত্তি না হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও নাগরিকদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, যা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।

বাজেট বাস্তবায়নের নিম্ন হার নিয়ে উদ্বেগ স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, এবার সব মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সব উন্নয়ন প্রকল্প রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা হবে, যাতে যেকোনো বিলম্ব বা বাধা দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।

ভবিষ্যতে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৪টি বিষয়কে মানদণ্ড ধরা হবে: অর্থের সঠিক মূল্য (Value for Money), বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত টেকসই স্থায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলের প্রায় ১,৩০০ চলমান প্রকল্প পর্যালোচনা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেগুলো এই মানদণ্ডে টিকবে না সেগুলো বাতিল বা অর্থনৈতিক রিটার্ন বাড়াতে পুনর্বিন্যাস করা হবে।

পুঁজিবাজারে সংস্কার ও বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমনস্ত্রী বলেন, সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি নতুন পেশাদার নেতৃত্ব দল নিয়োগ দেওয়া হবে। এই সংস্কারের ফলে বাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে, ব্যাংকিং খাতের ওপর ঋণের চাপ কমবে এবং ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সংগ্রহ করতে পারবেন। অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক ফান্ড ম্যানেজারসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।