আগামী ১১ জুন প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য আকার নিয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ হওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক তার আগেই বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এই তাগিদ এলো।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ জোগানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও গত ১৪টি অর্থবছর ধরে জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের অংশ ১০ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দের হার নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৫.৯ শতাংশে।
এই ধারাবাহিক পতন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি (বিএইএ) আগামী বাজেটে কৃষি খাতে অন্তত ৯.৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে, যা অঙ্কের হিসাবে প্রায় ৮৮,৩৫০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) প্রখ্যাত অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এএসএম গোলাম হাফিজ সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেন।
অধ্যাপক হাফিজ গত তিন অর্থবছরের বরাদ্দের একটি উদ্বেগজনক নিম্নমুখী চিত্র তুলে ধরে জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বাজেটে কৃষির অংশ ছিল ৮.৭ শতাংশ, তা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমে এসেছে মাত্র ৫.৯ শতাংশে।
তিনি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই বরাদ্দ পুনরায় বাড়িয়ে ৯.৫ শতাংশ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ৯.৩ লাখ কোটি টাকার প্রাক্কলিত জাতীয় বাজেটের ওপর ভিত্তি করে এই ৯.৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলে কৃষি খাত পাবে প্রায় ৮৮,৩৫০ কোটি টাকা। তার বাজেট সুপারিশের অন্যতম প্রধান দিক ছিল উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ভর্তুকির আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।
অধ্যাপক হাফিজ আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি বাড়িয়ে ৩৫,০০০ কোটি টাকা করার দাবি জানান, যা চলতি অর্থবছরের ১৭,২৪১ কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
তিনি যুক্তি দেখান যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা (বিশেষ করে ইরান ও হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক পরিস্থিতি) এবং মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে সার, জ্বালানি, বীজ এবং কৃষি যন্ত্রপাতির আমদানি খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ কৃষকরা চরম আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছেন।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে সরকারকে অবশ্যই কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, “সীমিত কৃষিজমি এবং প্রতি মৌসুমে আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ। তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজেটে অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, ফসলি জমি হ্রাস পাওয়া এবং উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে অনেক কৃষক লোকসান এড়াতে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কৃষি উপকরণের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার বিষয়ে বাজেটে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বরাদ্দ ও ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান ব্যবধান:
জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ হলেও দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে আর্থিক সহায়তা বাড়েনি। ২০১১-১২ অর্থবছরে কৃষি খাত মোট বাজেটের ১০.৬৫ শতাংশ পেয়েছিল। তা ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৮.৭ শতাংশে এবং চলতি অর্থবছরে তা এক ধাক্কায় ৫.৯ শতাংশে নেমে আসে।
সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, কৃষি-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বরাদ্দকৃত ৪৬,২৬৮ কোটি টাকার মধ্যে মূল শস্য খাত পেয়েছে মাত্র ২৭,২২৪ কোটি টাকা—যা মোট বাজেটের মাত্র ৩.৪৫ শতাংশ। একই সাথে কৃষি ভর্তুকিও হ্রাস পেয়েছে; যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ১৭,২৬১ কোটি টাকা, সেখানে চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭,২৪১ কোটি টাকায়।
“কৃষি ভর্তুকি কোনো খরচ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ,” উল্লেখ করেন বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে তা অনিবার্যভাবে উৎপাদনকে ব্যাহত করবে, আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াবে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে—যা গত চার বছরের অধিকাংশ সময়ই ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
কাঠামোগত পরিবর্তন ও বাজারের প্রতিবন্ধকতা:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কৃষকরা ধান, শাকসবজি, মাছ, ভুট্টা এবং আলুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ালেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট এবং সরকারি সংরক্ষণাগারের অভাবে তারা ক্রমাগত ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বর্তমানে দেশে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা মাত্র ২২ লাখ টন, যেখানে বর্তমান বাস্তবতায় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন অন্তত ৬০ লাখ টন। এছাড়া কোল্ড চেইন (শীতলীকরণ সরবরাহ শৃঙ্খল) এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে প্রতি বছর ফসল কাটার পর বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষির ধরনেও একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। স্বাধীনতার পর কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের অবদান যেখানে ৭৫ শতাংশের বেশি ছিল, তা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশে। অন্যদিকে মৎস্য, গবাদি পশু এবং বনায়ন খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। তবে পশুখাদ্য ও মুরগির ওষুধের আকাশচুম্বী দামের কারণে ডেইরি ও পোল্ট্রি খামারিরা চরম সংকটে পড়েছেন বলে জানান অধ্যাপক হাফিজ।
জলবায়ু ঝুঁকি ও যান্ত্রিকীকরণে স্থবিরতা:
কৃষি খাত বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন। চলতি বছর আগাম আকস্মিক বন্যা এবং ভারী বৃষ্টিপাতে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা কৃষকদের আয় পঙ্গু করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এর সমাধানে জরুরি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন, জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং সমন্বিত কৃষি বিমা চালুর জোরালো সুপারিশ করেছেন।
পাশাপাশি, সরকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ভর্তুকি প্রকল্পটি অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। নীতি বিশ্লেষকরা প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ‘কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যাংক’ স্থাপন এবং কৃষি যন্ত্রপাতির খুচরা যন্ত্রাংশ দেশীয়ভাবে তৈরির সুবিধার্থে শুল্ক ছাড় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ তার কৃষি জিডিপির মাত্র ০.৪ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে, যেখানে অনেক উন্নয়নশীল দেশ ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে থাকে।
একটি প্রকৃত কৃষক-বান্ধব বাজেট প্রণয়নের জন্য বিশেষজ্ঞরা সারসংক্ষেপ টেনে বলেন, আগামী বাজেটে কৃষি অর্থায়নকে অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করা, ভর্তুকি বাড়িয়ে ৪০,০০০ কোটি টাকা করা, জাতীয় কৃষক ডেটাবেজের মাধ্যমে সংগ্রহ অভিযান ডিজিটালাইজ করা এবং জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুততর করা এখন সময়ের দাবি।