বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
সর্বশেষ:
আর্থিক, রাজস্ব ও বিনিময় হার—তিন খাতে ব্যাপক সংস্কার দরকার: আইএমএফ জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে দুদিনে ১২ কোটি ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্র খাতে সম্পর্ক জোরদারে ঢাকা-বেইজিং ঐকমত্য ঢাবি শামসুন নাহার হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় লিমা চ্যাম্পিয়ন ব্যাংক রেজোলিউশন কাঠামো কি অযোগ্য মালিকদের প্রত্যাবর্তনে সফল হতে পারে? শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বেপজা ৪৬ বছরে পদার্পণ: দেশের জাতীয় রপ্তানির ১৭ শতাংশ অবদান রাখছে টাইমের ২০২৬ সালের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় তারেক রহমান ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে দুদিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব শুরু

ব্যাংক রেজোলিউশন কাঠামো কি অযোগ্য মালিকদের প্রত্যাবর্তনে সফল হতে পারে?

মামুন রশিদ

আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে ২০২৫ সালের ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট’-এর কাঠামো তৈরির কাজ করেছি। এই কাঠামোটি মূলত ভারতের ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপসি কোড ২০১৬’ এবং ইন্দোনেশিয়াসহ সমপর্যায়ের অর্থনীতিগুলোর অনুরূপ ব্যবস্থার আদলে তৈরি করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকগুলোকে তাদের পুরনো খেলাপি মালিকদের হাত থেকে রক্ষা করা। সেই মালিকরা ক্রমাগত ইনসাইডার লেন্ডিং (নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে ঋণদান) এবং মন্দ ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পঙ্গু করে ফেলেছিলেন, কিন্তু মূলধন ঘাটতি মেটাতে নতুন পুঁজি জোগানে ছিলেন বিমুখ।

যারা এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে মূলধন ভিত্তি না বাড়িয়ে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে পারবে না, এমনকি ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়বে। যদিও সরকার নিজে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ পুনর্গঠনে মূলধন জুগিয়েছে, তবে মূল একীভূতকরণ (Merger) কাঠামোর গন্তব্য ছিল এমন এক মডেল—যেখানে নতুন মালিক বা কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি-ভিত্তিক নতুন মূলধন নিয়ে এগিয়ে আসবেন। এটি অত্যন্ত জরুরি ছিল কারণ আগের খেলাপি মালিকদের অধিকাংশ হয় আইনি ব্যবস্থা এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, অথবা তাদের আর্থিক সামর্থ্যই ছিল না নগদ সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোতে নতুন তহবিল দেওয়ার।

২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ সংশোধন করে আইনে পরিণত করেছে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে একটি বিতর্কিত পথ তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো আবার তাদের সাবেক মালিকদের কাছে ফিরে যেতে পারবে। এই বিধান অনুযায়ী, সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া মোট তহবিলের মাত্র ৭.৫ শতাংশ পরিশোধ করেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। আর এখানেই বিপদের ঘণ্টা জোরে বাজছে।

‘সমকাল’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে এই বিধানের বিরোধিতা করেছিল। সংসদীয় বিরোধী দলগুলোও আপত্তি তুলেছিল। তা সত্ত্বেও ১৮(এ) ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেই বিলটি পাস হয়।

এই ধারায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অর্ডিন্যান্সের আওতায় থাকা সাবেক শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপযুক্ত মনে করা যেকোনো ব্যক্তি শেয়ার, সম্পদ ও দায়বদ্ধতা পুনরায় ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীদের কিছু অঙ্গীকারনামা দিতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে: সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব অর্থ ফেরত দেওয়া, মূলধন ঘাটতি মেটাতে নতুন পুঁজি জোগান, আমানতকারী ও পাওনাদারদের দাবি মেটানো, সব কর ও রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন করা এবং রেজোলিউশন চলাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। আর্থিক শর্ত হিসেবে, চূড়ান্ত অনুমোদনের তিন মাসের মধ্যে মোট ইনজেক্ট করা তহবিলের ৭.৫ শতাংশ সমমূল্যের পে-অর্ডার জমা দিতে হবে এবং বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ বার্ষিক ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

উদ্বেগের বিষয়টি এখানে স্পষ্ট। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে একবার মালিকানা ফিরে পেলে (তা শর্তসাপেক্ষ হলেও) তাদের পুনরায় সরানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যে পরিমাণ পদ্ধতিগত ক্ষতি ইতিমধ্যে করা হয়েছে, তার বিপরীতে ৭.৫ শতাংশের প্রাথমিক শর্তটি একেবারেই নগণ্য।

১৮(এ) ধারাটি যেভাবে বিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেটিও সমান উদ্বেগের। ১ এপ্রিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি ৯৮টি ধারা থেকে কমিয়ে ৭৪টি করার সুপারিশ করেছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়, লেজিসলেটিভ ও সংসদীয় বিষয়ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি এই বিশেষ ধারাটির সুপারিশ করেনি। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিলটি সংসদে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে এটি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি পরের দিন সকালে জানতে পারে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে এটি নিয়ে এগোতে নিষেধ করলেও কোনো ফল হয়নি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর যুক্তি ছিল সঠিক—যাদের কারণে ব্যাংকের এই দশা হয়েছে, তাদের মালিকানা ফিরে পাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত ছিল। আমানতকারী ও পাওনাদারদের সব দায় মেটানো মালিকানা পাওয়ার ‘পূর্বশর্ত’ হওয়া উচিত ছিল, ভবিষ্যতে করার কোনো ‘অঙ্গীকার’ নয়। বাস্তব ক্ষেত্রে এই পার্থক্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

ক্ষতির বিশালতা দেখলেই বোঝা যায় কেন এটি আশঙ্কাজনক। ২০২৫ সালের অর্ডিন্যান্সের অধীনে পাঁচটি শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—একীভূত করে একটি কনসোলিডেটেড ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ৩৫,০০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০,০০০ কোটি টাকা এবং বাকি ১৫,০০০ কোটি টাকা এসেছে ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ও ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ড থেকে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ছিল ১,৯৬,৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১,৬৫,৭৮১ কোটি টাকা বা ৮৪.২৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যেখানে পুরো ব্যাংকিং খাতে ডিফল্ট রেট ৩০.৬ শতাংশ। এছাড়া গত ডিসেম্বরে ২২টি ব্যাংক মোট ২,৮২,৬০৩ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছিল, যার মধ্যে ১,৫০,৬৯১ কোটি টাকাই ছিল এই পাঁচটি ব্যাংকের ঘাটতি। নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এক্সিম ব্যাংকের অবস্থা তুলনামূলক ভালো (খেলাপি ঋণ ৬২.৪৫ শতাংশ এবং ঘাটতি ২২,৬২৫ কোটি টাকা)। কিন্তু বাকি চারটি ব্যাংক (যা আগে এস. আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল) এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে: ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৭.৬৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬.৪৩ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৬.২৭ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৫.৭৩ শতাংশ। এদের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি হাজার হাজার কোটি টাকা।

এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো: যখন এই ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা ব্যাংকগুলোকে প্রায় রক্তশূন্য করে ফেলেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ঋণ পুনর্গঠন স্ক্রুটিনি কমিটির তথ্য অনুযায়ী স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, তখন কি এই ব্যাংকগুলোকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব? নাকি আমরা কেবল একটি নতুন ‘পান্ডোরা’স বক্স’ খুলছি?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত—যা উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন স্বল্পতা এবং মালিকদের দ্বারা লুটের জন্য পরিচিত—সেখানে কোনো আংশিক সমাধান নয়, বরং আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা ক্রনিজম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং খাত রক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বিকৃত না করে স্বাধীনতা, স্বার্থের সংঘাত রোধ এবং কঠোর রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সই হওয়া উচিত আগামীর পথ।


লেখক: মামুন রশিদ, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড।