নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অভ্যন্তরীণ গভীর অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাজার আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং আর্থিক খাতের ক্ষত সারাতে মন্ত্রিসভাকে অবিলম্বে কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ব্যয় ও রাজস্বের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব দূর করতে নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের পর এই রূপান্তরকাল চলছে। অন্তর্বর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি এবং অর্থপাচার রোধে কড়াকড়ি দেখা গেলেও, বেসরকারি খাতে ঋণের নিম্ন প্রবৃদ্ধি, স্থবির বিনিয়োগ এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে অভ্যন্তরীণ খাত এখনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমান তারল্য সংকট কাটাতে এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অর্থনীতিবিদরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করেছেন:
১. বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার
উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিদ্যমান ‘আস্থার সংকট’ দূর করাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলতে পারে না। বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্থবির হয়ে পড়া প্রকল্পগুলো পুনরায় শুরু করতে উৎসাহিত করবে।
২. আর্থিক খাত সংস্কার ও সুদের হার ব্যবস্থাপনা
ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণে (NPL) জর্জরিত। তারল্য বাড়াতে ব্যাংকিং সংস্কার ত্বরান্বিত করা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, মুদ্রাস্ফীতি স্থিতিশীল হওয়ার পর ব্যবসার খরচ কমাতে সুদের হার (যা আগের সংকোচনমূলক নীতির কারণে ৯% থেকে ১৬% এ উন্নীত হয়েছে) কমিয়ে আনার কথা বলেছেন তারা।
৩. রাজস্ব বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ
রাজস্ব আদায় হ্রাস এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে সরকার বড় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে। সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত অপচয় রোধ করলে অপ্রয়োজনীয় খরচ বাঁচানো সম্ভব হবে। রাষ্ট্রীয় তহবিল অদক্ষতার কারণে নষ্ট না করে উৎপাদনশীল অবকাঠামোতে ব্যয় নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
৪. বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি
জুলাই থেকে জানুয়ারির মধ্যে রেমিট্যান্স ২১.৭৫ শতাংশ বাড়লেও গত পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় স্থবির রয়েছে। রপ্তানিকারকদের কাঠামোগত সহায়তা প্রদান এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কড়াকড়ি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে সহজ শর্তে বিদেশি ঋণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, “আর্থিক খাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরিয়ে রাজস্ব বাড়াতে হবে। সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আচরণগত পরিবর্তন দেখাতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সরকার যদি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে, তবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে আসবে।”
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) ছিল মাত্র ৬৫০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রকৃত মূলধনী বিনিয়োগ ছিল নগণ্য। এছাড়া টাকার মান ৮৬ থেকে ১২৩-এ নেমে আসায় উৎপাদন খরচ ব্যাপক বেড়েছে। নতুন প্রশাসনকে মুদ্রার স্থিতিশীলতা ও রপ্তানি সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, টেকসই ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা। বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়, তাই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।